শ্রমজীবী থেকে তারকা পরিবার, বাল্যবিবাহ যখন মগজে
বাল্যবিয়ে সমাজের কোন স্তরে কেমন
সূত্র : ব্র্যাকের সেলপ কর্মসূচির প্রতিবেদন, ২০২৩
বয়স মাত্র ১৫ বছর, এই বয়সেই নিজের বিয়ের ঘোষণা দিল শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিত এক মুখ। তার এই ঘোষণা বাল্যবিবাহের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। পরে ওই শিল্পী জানায়, কেবল বাগদান হয়েছে এবং আইন মেনে নির্ধারিত সময়েই বিয়ে হবে। অর্থাৎ আরও তিন বছর পর, যখন তার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে। কারণ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স এটিই।
তবে তার এই পরের বক্তব্যও আলোচনা থামাতে পারেনি। যেহেতু এই শিশুশিল্পী সংবাদমাধ্যমে পরিচিত মুখ এবং অনেকেই তাঁকে অনুসরণ করেন, তাই প্রশ্ন উঠেছে—এই কিশোরী যে উদাহরণ তৈরি করল, তার ক্ষতি কতটা হতে পারে তা কি তার পরিবার ভেবে দেখেছে?
এই খবর পড়তে পড়তে মনে পড়ে গেল সাতক্ষীরার একটি ঘটনা। বাল্যবিবাহ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনের কাজে গত বছরের সেপ্টেম্বরে উপকূলীয় এই জেলায় গিয়েছিলাম। চার দিন ধরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাল্যবিবাহের শিকার পরিবারের সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম।
সেই সময় ২১ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার বৈকারী ইউনিয়নে বাল্যবিবাহের শিকার এক কিশোরীর বাড়িতে গিয়েছিলাম স্থানীয় অধিকারকর্মী সাকিবুর রহমানের সঙ্গে। মাসখানেক আগে ১৫ বছর বয়সী সেই মেয়েটির বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দিয়েছিল প্রশাসন। কথা বলতে গিয়ে শ্রমজীবী পরিবারের মেয়েটির বাবা-মায়ের রাগান্বিত প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়েছিল। একপর্যায়ে তাঁরা কথা বলতে রাজি হলেও তাঁদের কথায় বাল্যবিবাহ দিতে গিয়ে ধরা পড়ার আফসোসই ফুটে উঠছিল। মেয়েটির মা বলেছিলেন, ‘অন্য কারও বিয়ে কি বন্ধ থাকল? খালি আমার মেয়ের বিয়েই বন্ধ হলো!’ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মেয়েটিও জানিয়েছিল, গত বছর তার পাঁচ সহপাঠীর বিয়ে হয়েছে, কারওটা আটকায়নি।
অন্য কারও বিয়ে কি বন্ধ রইল? খালি আমার মেয়ের বিয়ে বন্ধ হইল!
— সাতক্ষীরার নারী, মেয়েকে বাল্যবিবাহ দিতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে
বাল্যবিবাহ বন্ধে আইন, আইনের প্রয়োগ এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে সরকারের নানা কর্মসূচি রয়েছে। কিন্তু ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুশিল্পী হোক বা সাতক্ষীরার সাধারণ গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী—বাল্যবিবাহের এই দুটি চিত্র নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। তবে কি বাল্যবিবাহের ধারণা মানুষের মনের ভেতরেই গেঁথে আছে?
দেশে নারী শিক্ষার বিস্তার হলেও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত—কোনো পরিবারই নারীদের নিয়ে কেবল বিয়ে কেন্দ্রিক চিন্তা থেকে এখনো বের হতে পারেনি বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম।
বাল্যবিবাহ মাঝেমধ্যে আইনের জালে আটকা পড়লেও সেটিকে পুরোপুরি বন্ধ হওয়া বলা যায় না। কারণ, বিয়ের পর প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো যাবে না—অভিভাবকদের দেওয়া এমন অঙ্গীকারনামা পরে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। মেয়েটিকে ঠিকই শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গাজীপুরের শ্রীপুরে ১৩ বছরের এক কিশোরীর বাবা-মায়ের মতো অনেকেই ‘১৮ বছরের আগে বিয়ে দেব না’ বলে রাতে অঙ্গীকার করে ভোরেই মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন।
তাই শুধু আইন কঠোর করলেই যে এই সমস্যার সমাধান হবে না, তা বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন। তাঁর মতে, কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে বাল্যবিবাহ ঠেকানো যাবে, তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে এরপর ব্যবস্থা নিতে হবে।
মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর নির্ধারণের মূল কারণ হলো স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং শারীরিক ও মানসিক পূর্ণতা পাওয়ার পর সংসার জীবন নিশ্চিত করা। বাল্যবিবাহ রোধের মাধ্যমে মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমানো এবং প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোই এর উদ্দেশ্য।
বাল্যবিবাহ বন্ধে এই দেশে প্রথম আইন হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২৯ সালে। সেই আইন দিয়েই চলছিল পাকিস্তান আমল। বাংলাদেশ হওয়ার পর কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ২০১৭ সালে হয়েছিল বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন। তবে এত কিছুর পরও বাল্যবিবাহ থেমে নেই।
সামান্য কিছু তথ্য দিলেই বোঝা যাবে বাল্যবিবাহের বর্তমান অবস্থা কতটা ভয়াবহ। গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফ প্রকাশিত ‘বহুনির্দেশক গুচ্ছ জরিপ’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে প্রতি দুটি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের মধ্যে একজন বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। দেশজুড়ে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার ৫৬ শতাংশ। বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরী বয়সে মা হওয়ার ঘটনাও বেড়েছে। কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার প্রতি হাজারে ৯২ জন।
প্রতিবেদনে বাল্যবিবাহের ক্ষতির দিক তুলে ধরে বলা হয়, এর ফলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সম্ভাবনার দিক থেকে বছরে সাত থেকে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমান গতিতে চললে বাল্যবিবাহমুক্ত দেশ গড়তে ৬৪ বছরেরও বেশি সময় লাগবে।
সাতক্ষীরায় ২০ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার দিনে সাতটি স্কুল ও মাদ্রাসা ঘুরে এবং আরও চারটি স্কুলের তথ্য নিয়ে দেখা গেছে, ওই ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটেছে। ৪৮ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে দশম শ্রেণিতে ওঠার আগেই। আর বাল্যবিবাহের সঙ্গে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া এবং কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
দেশে বছরে ঠিক কতগুলো বাল্যবিবাহ হয়, সেই সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায় না। উপজেলা পর্যায়ে শুধু বাল্যবিবাহ ঠেকানোর ঘটনার হিসাব রাখা হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সাহায্যকারী নম্বর ১০৯-এর হিসাব থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে বাল্যবিবাহের অভিযোগ নিয়ে ৯৯১টি ফোন এসেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৮৬৫টি।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে বাল্যবিবাহের অভিযোগ নিয়ে ৭৩৩টি ফোন এসেছে। অর্থাৎ দিনে গড়ে আটটি করে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ‘কনে হওয়ার জন্যই যেন জন্ম’ শিরোনামে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিবাহের পেছনে দারিদ্র্যকে বড় কারণ বলা হলেও ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারেও বাল্যবিবাহের হার অনেক বেশি।
বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি দরিদ্র পরিবারে, যা প্রায় ৬০ শতাংশ। তুলনামূলক কম দরিদ্র পরিবারে এই হার প্রায় ৬২ শতাংশ, মধ্যবিত্ত পরিবারে প্রায় ৫৫ শতাংশ, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে ৫৪ শতাংশের বেশি এবং উচ্চবিত্ত পরিবারে ৫০ শতাংশের বেশি। যে পরিবারে একটি মাত্র মেয়ে রয়েছে, সেখানে বাল্যবিবাহের হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি (৮৯ শতাংশ)।
মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, তাঁদের সময়ে মেয়েদের পড়াশোনা শেখানো হতো মূলত বিয়ের বাজারে দাম বাড়ানোর জন্য। বিয়েটাই ছিল মূল লক্ষ্য। মেয়েটিকে বিয়ের জন্য কীভাবে তৈরি করা হবে, সেটাই ভাবা হতো। নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবা হয় না।
যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে নারী শিক্ষার বিস্তার হলেও নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত কোনো পরিবারই মেয়েদের নিয়ে কেবল বিয়ে কেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বের হতে পারেনি বলে মনে করেন ফওজিয়া মোসলেম।
ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমরা চাই, নারীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হোক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নানা অস্থিরতা ও জটিলতায় নারীর চলার পথে বাধা দ্বিগুণ হয়েছে। অনেকে এত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে চান না। দ্রুত বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করতে চান। নারীবিদ্বেষী প্রচারও বাল্যবিবাহের মতো প্রথাকে আরও উৎসাহিত করছে।’
বাল্যবিবাহের প্রবণতা বন্ধে আইন কঠোরভাবে মেনে চলা উচিত বলে মনে করেন ফওজিয়া মোসলেম।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ে ও ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ।
বাল্যবিবাহ করা, সম্পন্ন করা ও পরিচালনার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল বা কারাদণ্ডের নিয়ম রয়েছে।
আইনে বাল্যবিবাহের শাস্তি হিসেবে ৭ (১) ধারায় বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে বাল্যবিবাহ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। জরিমানা না দিলে সর্বোচ্চ তিন মাসের জেল হবে।
৭ (২) উপধারায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলেও সর্বোচ্চ এক মাসের আটকাদেশ বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের সাজা পেতে পারে। তবে ৮ ধারায় দণ্ড কার্যকর হলে অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষ সাজা পাবে না।
আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, বাবা-মা, অভিভাবক অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি বাল্যবিবাহ দিলে বা অনুমতি দিলে অথবা অবহেলার কারণে বাল্যবিবাহ বন্ধে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ দুই বছর, সর্বনিম্ন ছয় মাস অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানায় দণ্ডিত হবেন।
তবে আইনের ১৯ ধারায় বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্কের কল্যাণে আদালতের নির্দেশে এবং মা-বাবা বা অভিভাবকের সম্মতিতে বাল্যবিবাহ হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে না।

Comments
Comments