[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

১০ রোগের টিকার ঘাটতি: কেন সময়মতো টিকা মিলছে না?

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ঈদের আগে হাসপাতালে ভর্তি হয় নরসিংদী থেকে আসা ছয় মাসের শিশু মোহাম্মদ। হামে আক্রান্ত হয়ে সে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গতকাল বিকেলে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

দেশে টিকার সংকট তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। এদিকে চলতি মাসে হামে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও সরকারি হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ায় মজুত শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে টিকার স্বল্পতা এবং জনবল কম থাকায় শিশু ও মায়েরা ঠিকমতো টিকা পাচ্ছে না। ফলে শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে অন্যান্য রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ টিকা কর্মসূচিতে সফল দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। নিয়মিত টিকাদান এবং বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। হামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, গাফিলতির কারণে একটি সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি।

বিসিজি পেন্টা বিওপিভি
এই
৬ টিকার
মজুত শূন্য
পিসিভি এমআর টিডি
Vaccine

মার্চ মাসে হামে মৃত্যু

ঢাকা
১৯
রাজশাহী
১২
ময়মনসিংহ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
শরীয়তপুর

টিকার সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভি বাংলাদেশকে টিকা কেনার জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়। গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, জনবল কম থাকা, টিকার সরবরাহ ও লজিস্টিক সমস্যার পাশাপাশি নিয়মিত টিকা কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। শহরের সব এলাকায় টিকা সমানভাবে পৌঁছে না। এছাড়া কোভিডের পর অনেক শিশু প্রথম ডোজ টিকা পেয়েও দ্বিতীয় ডোজ পাননি। এসব কারণে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এই শিশুরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত কিছু ঝুঁকি পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।

দেশে হামের সংক্রমণ বেড়েছে স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। যথাসময়ে টিকা সংগ্রহ করে তা দেওয়া শুরু করব।’

মন্ত্রী আরও জানান, শিশুদের হামের চিকিৎসার জন্য সংক্রামক রোগ হাসপাতালে ভেন্টিলেটরসহ আইসিইউ প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ এবং উত্তরাঞ্চলের হাসপাতালগুলোতেও শিশুদের হাম মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

দেশে টিকা দুইভাবে দেওয়া হয়। একটি হচ্ছে নিয়মিত টিকা কর্মসূচি। এটি সারা বছর ধরে চলে। মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের এই টিকা দেন। কোন বয়সে কোন টিকা দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট আছে।

নিয়মিত টিকার পাশাপাশি দেশে জাতীয় ক্যাম্পেইন চালানো হয়। এতে একটি নির্দিষ্ট বয়সী সব শিশুকে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে টিকার আওতায় আনা হয়। ক্যাম্পেইনের আগে দেশব্যাপী প্রচার-প্রচারণা করা হয়। এর পাশাপাশি ভিটামিন এ–এর জাতীয় ক্যাম্পেইনও হয়। নিয়মিত টিকাদানের সময় বাদ পড়া শিশুরা ক্যাম্পেইনের সময়ে টিকা পায়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধের জন্য ৯টি টিকা দেওয়া হয়। বিভিন্ন বয়সের শিশুদের সাতটি টিকা দেওয়া হয়। বিসিজি টিকা যক্ষ্মা প্রতিরোধে দেওয়া হয়; পেন্টা টিকা ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ–বি ও হেপাটাইটিস–বি প্রতিরোধে দেওয়া হয়; ওপিভি ও আইপিভি টিকা পোলিও প্রতিরোধে দেওয়া হয়; নিউমোনিয়া প্রতিরোধে পিসিভি টিকা দেওয়া হয়; এমআর টিকা হাম ও রুবেলা প্রতিরোধে দেওয়া হয় এবং টিসিভি টিকা টাইফয়েড প্রতিরোধে দেওয়া হয়।

ইপিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।
দুটি টিকা দেওয়া হয় নারীদের। এর মধ্যে ১০ বছরের বেশি বয়সী কিশোরীদের এইচপিভি টিকা দেওয়া হয় জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে এবং প্রজননক্ষম ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় টিডি নামের টিকা।

ইপিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।

তবে মাঠপর্যায়ে কোনো কোনো টিকার ঘাটতি আছে বলে ইপিআই এবং দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
 

দাতা সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসপি) থাকা অপারেশন প্ল্যান (ওপি) অনুযায়ী। ওপির মাধ্যমে লাইন ডিরেক্টর ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় তুলনামূলকভাবে কম সময়ে টিকা কিনতে পারতেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি বা ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে নতুন প্রকল্প–দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং অর্থ ছাড়—সবকিছুতে বিলম্ব হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বড় ভূমিকা রাখেন। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন ডিজির পদ খালি ছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অধ্যাপক আবু জাফর ডিজি ছিলেন। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন ডিজির পদে বসেন অধ্যাপক প্রভাত কুমার বিশ্বাস। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই হামের টিকা–সংকটের পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ জানান, মন্ত্রণালয় যদি দ্রুত টাকা ছাড়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

একদিকে টিকার সংকট, অন্যদিকে রয়েছে জনবল ঘাটতি। ইপিআইয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দেশের ২৭ জেলায় স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৭ জেলায় জনবল সমস্যা প্রকট। এই ৩৭ জেলায় মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই। মাঠ পর্যায়ের এই কর্মীরা ইউনিয়নের নির্দিষ্ট ওয়ার্ডের টিকাকেন্দ্রে টিকা দেন। দেশে এখন প্রায় দেড় লাখ টিকাকেন্দ্র আছে।

সংকটের আরেকটি কারণ কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ। যেমন, পোর্টাররা ৯ মাস ধরে বেতন পাননি। ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহারিয়ার সাজ্জাদ বলেন, সারা দেশে ১ হাজার ৩২৬ জন পোর্টার আছেন। তারা উপজেলা সদর থেকে বিশেষ পাত্রে করে প্রতিদিন টিকা পৌঁছে দেন টিকাকেন্দ্রে।

উদাহরণ আরও আছে, ২০২৫ সালে এক বছরের মধ্যে সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে গেছেন। এই সময়ে সারা দেশে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, কোনো এলাকায় টিকা নেই, সেখানে হয়তো জনবল আছে। আবার কোথাও জনবল আছে, টিকা নেই। কোনো কোনো জায়গায় দুটিই নেই।

শনিবার দুপুর থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত আরও দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে চলতি মাসে হামে পাঁচটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল জানিয়েছে, এ মাসে হামে আক্রান্ত ১৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে দুই দিন আগে তারা তিনজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। একই সময়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে মারা গেছে তিনটি শিশু।

শরীয়তপুরে হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে। এতে এ বছর এবং চলতি মাসে ৪১ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত হলো। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এত বেশি হামের কারণে শিশুর মৃত্যু হয়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হামে এত শিশুর মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। এজন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই দায়ী। কেন টিকা ফুরালো, কেন শিশুরা মারা গেল—এসব অনুসন্ধান ও তদন্ত করা জরুরি। এটা চলতে দেওয়া যায় না।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন