রাজবাড়ীর পদ্মায় বাসডুবি, সেই ভয়াল দুপুরে যা ঘটেছিল
![]() |
| ডুবে যাওয়ার প্রায় ছয় ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার সাহায্যে বাসটি টেনে তোলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে গত বুধবার বিকেলে সৌহার্দ্য পরিবহনের যে বাসটি ডুবে যায়, সেটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে এসেছিল। শুরুতে ৬ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি রওনা হলেও দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বাসে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন।
এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। দাফনের জন্য প্রতিটি লাশের বিপরীতে ২৫ হাজার টাকার চেকও দেওয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৮ জন রাজবাড়ী জেলার বাসিন্দা।
বাস দুর্ঘটনার ঘটনায় জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্য এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। শনিবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির পাঁচ সদস্য দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন।
বাসডুবিতে নিহত হয়েছেন যাত্রী রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২) ও মেয়ে ঢাকার সাভার ক্যান্টনমেন্ট বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী রাফিয়া আক্তার (১২)। রেজাউল করিমের বাড়ি গোয়ালন্দ উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের চরবারকি পাড়া। দুর্ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, তাদের বাসটি পাঁচটার কিছু আগে ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্টে পৌঁছায়। সেখান থেকে বাসসহ আরও কয়েকটি গাড়ি ৩ নম্বর ঘাটে পাঠানো হয়। ঘাটে গিয়ে তারা দেখেন একটি ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে। তখন বাসটি ঘাটের সংযোগ সড়কে অপেক্ষা করছিল।
রেজাউল বলেন, ‘বাসের সি-১ ও সি-২ নম্বর আসনে বসে ছিল মর্জিনা ও রাফিয়া। এ সময় মর্জিনা পেয়ারা খেতে চাইলে আমি কিনে দেই। সে আমাকে একপ্রকার জোর করে খাইয়ে দেয়। এরপর বলে, আসরের নামাজের সময় চলে যাচ্ছে, নামাজ পড়ে নেই। তার সিটের সামনে আমি আড়াল হয়ে দাঁড়ালে মর্জিনা নামাজ পড়ে। পরে আমি বাস থেকে নেমে দুই বছর চার মাস বয়সী মেয়ে রাইসাকে কোলে নিয়ে পন্টুনে হাঁটছিলাম। কিছুক্ষণ পর শুনি, বাসের ব্রেক কাজ করছে না। পরে দেখি চালক আরমান অনেক চেষ্টা করেও বাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। সরাসরি বাসটি নদীতে পড়ে যায়। মধ্যরাতে বাসটি তুলে আনার পর আমার স্ত্রী, সন্তান এমনকি বাসচালকের লাশ আমিই শনাক্ত করি।’
বাসে যাত্রী হিসেবে ছিলেন চাঁদপুরের একটি কলেজের শিক্ষক সাকিব হোসেন। ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, জেলার কালুখালী উপজেলার গান্ধিমারা এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে ঈদের ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ছুটি শেষে বুধবার বিকেলে গান্ধিমারা থেকে বাসে ওঠেন। বাসটি ঘাটে পৌঁছানোর পর তিনি দেখেন একটি ফেরি চলে যাচ্ছে। পরের ফেরিতে ওঠার জন্য বাসটি ১৫-২০ মিনিট ঘাটে অপেক্ষা করে।
সাকিব হোসেন বলেন, ‘একটি ফেরিকে ঘাটে ভিড়তে দেখে আমি বাস থেকে নেমে ফেরির সামনে যাই। কিছুক্ষণ পর ফেরি থেকে দুই-তিনটি গাড়ি নামানোর পর পেছনে ফিরে দেখি, আমি যে বাসে ছিলাম সেটি হঠাৎ এগিয়ে আসছে। আমি চালকের দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি বাস নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার গতিতে বাসটি পন্টুনে এসে প্রথমে রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে অর্ধেকটা, পরে পুরোপুরি নদীতে পড়ে যায়।’
৩ নম্বর ফেরিঘাটের পন্টুনের লস্কর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, ‘সেদিন বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে এনায়েতপুরি নামের বড় ফেরিটি ঘাট ছেড়ে যায়। ফেরিটি যাওয়ার কয়েক মিনিট পরই ছোট ফেরি হাসনাহেনা ঘাটে ভেড়ে। তখন আমি পন্টুনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। পন্টুন থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে পন্টুন ও র্যামের সংযোগ সড়কের মাটির রাস্তায় সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি দাঁড়িয়ে ছিল। তার পেছনে ছিল লালন পরিবহনের একটি বাস এবং আরেকটি ট্রাক।’
আব্দুর রহিম বলেন, ‘হাসনাহেনা ফেরি থেকে তখন মাত্র দুটি গাড়ি নামানো হয়েছে। ওই সময় সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসচালক গাড়ি চালু করেন, আমি নিজে দেখেছি। এরপরই গাড়িটি দ্রুতগতিতে সরাসরি পন্টুনের রেলিংয়ে ধাক্কা খেয়ে নদীতে পড়ে যায়। আমি দ্রুত সেখান থেকে সরে যাই। তখন হাসনাহেনা ফেরির গাড়ি নামানো বন্ধ করে দ্রুত বয়া, রশি, গামছা—হাতে যা ছিল, তা নদীতে ফেলে যাত্রীদের তোলার চেষ্টা করি। এ সময় ৬-৭ জন যাত্রীকে টেনে ওপরে তোলা হয়। পরে দ্রুত অন্য গাড়িগুলো নামিয়ে ফেরিটি ঘাট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর যা হয়েছে, তা সারা দেশের মানুষ দেখেছেন। জীবনে এমন দুর্ঘটনা আগে দেখিনি।’

Comments
Comments