কৃষকের কপালে ভাঁজ, সেচ মৌসুমে মিলছে না পর্যাপ্ত ডিজেল
| সারা দিন জমিতে কাজ করে রাতে ডিজেলের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় করছেন কৃষকেরা। অনেকে হাজির হচ্ছেন ট্রাক্টর নিয়ে। গতকাল রাতে শরীয়তপুর সদরের বাঘিয়া এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের কৃষক মো. আজগর এই বোরো মৌসুমে প্রায় তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। গত এক সপ্তাহে ডিজেলের খোঁজে তিনি কয়েকবার বাজারে গেলেও জ্বালানি তেল পেয়েছেন মাত্র একবার। চাহিদামতো ১০ লিটার তেল চেয়েও তিনি পেয়েছেন মাত্র ৪ লিটার। তাও আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারে ২০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে।
মো. আজগর মুঠোফোনে জানান, ডিজেলের দোকানগুলো বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। মাঝেমধ্যে খোলা পাওয়া গেলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।
পোমরার পাশের ইউনিয়ন সরফভাটা। সেই ইউনিয়নের পশ্চিম সরফভাটা গ্রামের কৃষক মো. আলমগীরও একই সমস্যার কথা জানালেন। তিনি বলেন, ধানের শিষ বের হচ্ছে। এই সময়ে ঠিকমতো সেচ দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হবে। তিনি প্রতিদিন ডিজেল কিনতে গেলেও দরকারি পরিমাণ তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না।
আজগর ও আলমগীরের মতো দেশের অনেক কৃষক এখন বিপাকে পড়েছেন। চট্টগ্রাম, জামালপুর, পটুয়াখালী, রাজশাহী, গাজীপুর, বরগুনা, সিলেট, ফরিদপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারীসহ দেশের ১২টি জেলার ১৫ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা সবাই ডিজেলের এই সংকটের কথা জানিয়েছেন। কেউ কেউ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তথ্যেও জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির চিত্র উঠে আসছে।
দেশের সেচযন্ত্রগুলোর একটি বড় অংশ ডিজেলে চলে, বাকি অংশ চলে বিদ্যুৎ দিয়ে। এ ছাড়া ধান, গম ও ভুট্টা কাটার যন্ত্র এবং মাড়াইয়ের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রের প্রধান জ্বালানি হলো ডিজেল ও পেট্রোল। এসব যন্ত্র পরিচালনাকারীরা এখন চাহিদামতো জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না।
কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সময়মতো ডিজেল না পাওয়ায় সেচ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি ফসল কাটা নিয়েও কৃষকেরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কয়েক দিন পরেই বোরো ধান কাটা শুরু হবে। তখন পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়া গেলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত ধান কেটে ফেলা জরুরি, যাতে আগাম বন্যায় ফসলের কোনো ক্ষতি না হয়।
স্থানীয় প্রশাসন অবশ্য কৃষকদের ডিজেলের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিচ্ছে। যেমন রাঙ্গুনিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘কৃষক আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। পাম্প ও দোকানগুলোতে নির্দেশ দেওয়া আছে যেন কৃষকদের সবার আগে ডিজেল দেওয়া হয়।’ কৃষকদের ডিজেল না পাওয়ার অভিযোগটি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত কৃষিতে সেচ মৌসুম চলে। দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলচালিত কৃষিযন্ত্রের সংখ্যা ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে গভীর ও অগভীর নলকূপ, সেচ পাম্প, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টর (ফসল কাটার যন্ত্র), ফসল মাড়াই ও ঝাড়াই করার যন্ত্রসহ নানা ধরনের সরঞ্জাম রয়েছে।
অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ফসল কেটে মাড়াই করে বস্তায় ভরে দেওয়ার আধুনিক যন্ত্র ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টর’ রয়েছে ১০ হাজার ৭২৬টি। এ ছাড়া ফসল মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র আছে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ছয় মাসের এই সেচ মৌসুমে সেচ ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র পরিচালনায় ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা থাকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এই সময়ে বৃষ্টি হলে সেচের প্রয়োজন কিছুটা কমে আসে। গত দুই সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছে। এতে আলু ও তরমুজসহ কিছু ফসলের চাষিরা কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধানসহ কিছু ফসলে সেচের চাহিদা কমেছে।
এদিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) হিসাবে, সেচ মৌসুমের ছয় মাসে শুধু সেচযন্ত্র চালাতেই জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য চাহিদা থাকে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন।
প্রয়োজনীয় এই জ্বালানি সময়মতো নিশ্চিত করা না গেলে বোরো চাষসহ সামগ্রিক কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশেও এর প্রভাবে সাধারণ ক্রেতারা আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি তেল কেনা শুরু করেছেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সমান পরিমাণ তেল সরবরাহ করলেও বর্তমান চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। যানবাহনগুলোতে তেল নেওয়ার জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রচুর ভিড় দেখা যাচ্ছে এবং সরবরাহ করা তেল দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলো দিনের বড় একটি সময় বন্ধ থাকছে। এর মধ্যে তেলের অবৈধ মজুতদারির ঘটনাও ঘটছে।
কৃষকেরা সাধারণত স্থানীয় বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে তেল কেনেন, যাদের অনেকেরই বিক্রয় করার অনুমতি বা লাইসেন্স নেই। দেশজুড়ে প্রশাসনের অভিযানে যেমন মজুত করা তেল ধরা পড়ছে, তেমনি জরিমানার ভয়ে অনেক বিক্রেতা তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। আবার তাঁরা নিজেরাও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছেন না। এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিকাজে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের গত বৃহস্পতিবারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে মজুত আছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন। দেশে দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টন হলেও এখন পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ১১ হাজার টন।
ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত কৃষি সেচ মৌসুমের ছয় মাস হিসাব করলে সব ধরনের কৃষিযন্ত্রে প্রতি মাসে গড় চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার টন। অর্থাৎ প্রতিদিনের চাহিদা প্রায় ৭ হাজার টন, যা বৃষ্টিপাতের ওপর কম-বেশি হতে পারে।
বরগুনা সদর উপজেলার কেউরবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. মামুন জানান, তাঁর একটি পাওয়ার টিলার থাকলেও ডিজেল সংকটে সেটি নিয়মিত চালাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘দোকানে মাঝেমধ্যে ডিজেল পাওয়া যায়, কিন্তু দাম অনেক বেশি। ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দিয়েও ডিজেল কিনতে হয়েছে।’ অথচ ডিজেলের নির্ধারিত দাম প্রতি লিটার ১০০ টাকা।
দেশে ধান ও গমের মতো ফসল কাটা এবং তা মাড়াই করে বস্তায় ভরার জন্য ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টর’ যন্ত্রের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। সরকার এসব যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হাওর এলাকায় ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ হারে ভর্তুকি দিয়েছে।
কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, বর্তমানে দেশের মোট আবাদি জমির ১৫ শতাংশ এলাকার ধান এই যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়, যা মূলত ডিজেলে চলে। অন্যদিকে ধান কাটার ছোট যন্ত্র ‘রিপার’ চলে পেট্রোল দিয়ে এবং ধান ঝাড়াই করার যন্ত্র ‘থ্রেশার’ চলে ডিজেলে।
কৃষিযন্ত্র খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস বলেন, ফসল কাটার যন্ত্র ও ট্রাক্টরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জ্বালানি সংগ্রহ ও সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া দরকার। এসব যন্ত্রের মালিকদের তালিকা কোম্পানিগুলোর কাছে রয়েছে। সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, একটি হারভেস্টারের দিনে ৬০ থেকে ৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হলে কৃষিতে বড় কোনো সমস্যা হবে না এবং তেলের অবৈধ মজুত করার সুযোগও থাকবে না।
জ্বালানিসংকটের কারণে কৃষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। এটা খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান
বোরো দেশের প্রধান ধানের মৌসুম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৪ কোটি ৯ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে ৫২ শতাংশই এসেছে বোরো থেকে।
বোরো ধানের একটি বড় অংশ আসে হাওর অঞ্চল থেকে। ২০১৭ সালে আগাম বৃষ্টি ও বন্যায় হাওরে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছিল, যার ফলে দেশে চালের উৎপাদন প্রায় আট লাখ টন কমে যায়। এর প্রভাবে তখন চালের বাজারদর অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত ধান কাটতে না পারার কারণে যাতে ফসলের কোনো ক্ষতি না হয়, তা আগেভাগেই নিশ্চিত করতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কৃষি যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। এটি সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তিনি আরও বলেন, কৃষি খাতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানি করা এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
Comments
Comments