[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রেন্ট-এ–কারের আড়ালে বাসসকে নিজের গাড়ি ভাড়া দিয়েছিলেন মাহবুব মোর্শেদ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
মাহবুব মোর্শেদ | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন 

নিজের মালিকানাধীন একটি গাড়ি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেছিলেন মাহবুব মোর্শেদ। তিনি যখন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি পদে ছিলেন, তখন এই ঘটনা ঘটে। ওই গাড়ি ভাড়া বাবদ মাসে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হতো।

মাহবুব মোর্শেদ সম্প্রতি বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট গল্পকার ও সাংবাদিক মাহবুব মোর্শেদকে দুই বছরের জন্য বাসসের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পরদিনই বাসসে গিয়ে কর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন তিনি। তখন তিনি কার্যালয় থেকে চলে যান এবং ফেসবুকের এক পোস্টে ‘জনতাকে উসকে দিয়ে’ তাঁকে সরানোর জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। পরে তাঁর পদত্যাগের খবর আসে। সর্বশেষ ১ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এর আগে মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি গঠিত এই কমিটিকে ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশসহ পুরো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর তিন সপ্তাহ পর মাহবুব মোর্শেদের পদত্যাগের খবর পাওয়া যায়। তবে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে—এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বাসস সূত্রের দাবি, মাহবুব মোর্শেদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ তদন্ত কমিটির কাছে জমা পড়েছে। এর মধ্যে নিজের গাড়ি বাসসকে ভাড়া দেওয়া, নিজের বেতন ও ভাতা নিজেই ঠিক করা, পদ না থাকলেও নিয়োগ দেওয়া এবং কর্মীদের হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

নথিপত্র থেকে জানা গেছে, মাহবুব মোর্শেদের মালিকানাধীন টয়োটা এলিয়ন মডেলের একটি গাড়ি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাসিক দেড় লাখ টাকা ভাড়ায় বাসসের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। এটি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে বলে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করছেন।

বাসস সূত্র বলছে, গাড়িটি মাহবুব মোর্শেদ নিজে ব্যবহার করতেন। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যবহারের জন্য আগে থেকেই বাসসের নিজস্ব একটি গাড়ি রয়েছে। সেটিও মাঝেমধ্যে ব্যবহার করতেন মাহবুব মোর্শেদ।

নথিপত্র অনুযায়ী, মাহবুব মোর্শেদের ব্যক্তিগত গাড়িটির জন্য জ্বালানি, চালক ও অন্যান্য খরচসহ মাসে দেড় লাখ টাকা ভাড়া ঠিক করা হয়। এই চুক্তি ছিল সপ্তাহের সাত দিন এবং ২৪ ঘণ্টার জন্য।

একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গাড়িও ওই সংস্থায় ভাড়ায় চলছে, যেটির মাসিক ভাড়া ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, এই গাড়ির ভাড়া আগেরটির অর্ধেকেরও কম। অবশ্য দ্বিতীয় গাড়ির চুক্তিতে সপ্তাহের সাত দিন বা ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের কথা উল্লেখ নেই।

এই বিষয়ে মাহবুব মোর্শেদের বক্তব্য জানতে গত ১৬ মার্চ তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এগুলো নিয়ে কথা বলার মতো মানসিকতা আমার নেই। আপনি প্রতিবেদন করুন, শুভেচ্ছা থাকল।’

ব্যক্তিগত গাড়ি ভাড়ায় খাটানো এবং বিল নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব মোর্শেদ বলেন, ‘না, এ রকম কিছু ঘটেনি।’ এরপর প্রতিবেদকের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি ফোন রেখে দেন।

পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়ে বক্তব্য চাওয়া হয়। প্রয়োজনে সরাসরি দেখা করে পরিচয়পত্র দেখিয়ে বক্তব্য নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তবে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সংস্থাটির সঙ্গে গাড়ি ভাড়ার চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘রেন্ট-এ-কার সার্ভিস’। বর্তমানেও ওই প্রতিষ্ঠানের একটি গাড়ি সেখানে ভাড়ায় চলছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবদুল কাদেরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি ডেকে বলেন যে এই গাড়িটি তোমার নামে চালাও, তখন আসলে আমার কিছু করার থাকে না।’

ভাড়ার টাকা থেকে তিনি কত পেতেন, তা জানতে চাইলে আবদুল কাদের জানান, দেড় লাখ টাকার পুরোটাই মাহবুব মোর্শেদ নিতেন।

বাসস সূত্র জানায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি পদে নিয়োগের সময় মাহবুব মোর্শেদের কোনো বেতন-ভাতা ঠিক করা ছিল না। পরে তিনি নিজেই একটি চুক্তিনামা তৈরি করে মূল বেতন নবম সংবাদপত্র মজুরি কাঠামোর বিশেষ গ্রেডের সর্বোচ্চ সীমা ১ লাখ ২ হাজার ৩৭৫ টাকা নির্ধারণ করেন। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, দাপ্তরিক ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, দায়িত্ব ভাতা ও চিকিৎসা ভাতাসহ মোট বেতন ধরেন ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৩৮ টাকা। এ ছাড়া তিনি পত্রিকা বিল ৪ হাজার ৯৫০ টাকা, মুঠোফোন বিল ৬ হাজার টাকা, ইন্টারনেট বিল আড়াই হাজার টাকা এবং সাময়িকী ও সংবাদপত্র বিল বাবদ ১০ হাজার ২৫০ টাকা ভাউচারের মাধ্যমে আলাদাভাবে নিতেন।

আরও জানা গেছে, বেতন-ভাতা নির্ধারণের পর দেখা যায়, এমডি পদে তাঁর বেতন বাসসের কয়েকজন সাংবাদিকের চেয়ে কম। তখন তিনি বিশেষ ভাতা হিসেবে বেতনের সঙ্গে প্রতি মাসে আরও ২২ হাজার টাকা করে নেওয়া শুরু করেন।

সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মাহবুব মোর্শেদের নেওয়া এই বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বিলের বিষয়ে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ কিছু জানত না। এমনকি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছেও বিষয়টি অজানা ছিল।

নথিপত্রে দেখা যায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে মাহবুব মোর্শেদ ২২ জনকে স্থায়ীভাবে এবং ৪১ জনকে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেন। প্রতিষ্ঠানের বর্তমান জনবল কাঠামোতে নেই—এমন পদেও কর্মীদের বসিয়ে বিভিন্ন ভাতা দিয়েছেন তিনি।

যেমন, নগর সম্পাদক এবং বাংলা বিভাগের প্রধান প্রতিবেদকের কোনো পদ জনবল কাঠামোতে নেই। কিন্তু মাহবুব মোর্শেদের সময়ে সেসব পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের পদ থাকলেও সরকারি মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হলে আগে পদ তৈরি করতে হয়। কিন্তু নিয়ম না মেনেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন