ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা আনুষ্ঠানিকতায় দিবসটি পালন করা হতো। গত ৫ আগস্ট ওই সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সংক্ষিপ্ত আকারে মুজিবনগর দিবস পালন করা হয়েছে। তবে ১৭ বছর পর এবার মুজিবনগর কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে দিবসটি পালনের রাষ্ট্রীয় কোনো আয়োজন নেই। মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, তাঁরা মৌখিকভাবে জানতে পেরেছেন যে এবার দিবসটি পালন করা হচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত চিঠি পাননি।
দেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী হিসেবে পরিচিত মেহেরপুরের মুজিবনগর অন্যতম। এই আম্রকাননেই ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়েছিল। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রথম মুজিবনগরকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীনতার স্মৃতি রক্ষায় ২৩টি স্তম্ভের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ৮০ দশমিক ৪২ একর জমি নিয়ে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি কমপ্লেক্স তৈরির কাজ শুরু করে।
মানচিত্র অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের ১১টি বিভাগকে আলাদা করে প্রায় ৬০০টি মূর্তির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন চিত্র এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে ঐতিহাসিক মুজিবনগরে যেতেন। তবে সেই মূর্তির প্রায় ৪০ শতাংশ ভেঙে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ভাঙা অংশগুলো এখন এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর সারা দেশের মতো মেহেরপুরের মুজিবনগরেও সাধারণ মানুষ আনন্দ মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। সেই সুযোগে কিছু দুষ্কৃতকারী মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার স্থানে নির্মিত মূর্তিগুলো ভাঙচুর করে। এসব ক্ষত নিয়েই এখন দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স।
২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বীরপ্রতীক বলেছিলেন, মুজিবনগর সরকারের নাম পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। কারণ, ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। তিনি জানান, ১০ এপ্রিল সরকার গঠন হলেও শপথ হয়েছে ১৭ তারিখে মুজিবনগরে। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল এই মুজিবনগর সরকার। এটি কোনো প্রবাসী কিংবা অস্থায়ী সরকার নয়। এই সরকারের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়, তাই এই সরকার হচ্ছে সাংবিধানিক সরকার। এই সরকারের শপথ গ্রহণ একটি গৌরবময় অধ্যায়। তিনি আরও বলেন, মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সে যে ক্ষতি হয়েছে, তা ঠিক করা হবে। এখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মোছা হবে না এবং নতুন কিছু চাপিয়েও দেওয়া হবে না। তবে এখনো সেই কমপ্লেক্স সংস্কার করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগ মুজিবনগর কমপ্লেক্সের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করে একটি তালিকা তৈরি করে। মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জামাল উদ্দিন বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ক্ষতিগ্রস্ত ও হারিয়ে যাওয়া জিনিসের তালিকা তৈরি করে পাঠানো হয়েছিল। তখন ঢাকা থেকে একটি দল এসে এলাকা পরিদর্শনও করে গেছে। সংস্কার করতে ৬০ লাখ ৮৭ হাজার টাকা খরচ হবে জানিয়ে অর্থ বরাদ্দের জন্য চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারি বাজেট না পাওয়ায় কাজ শুরু করা যায়নি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার (বর্তমান মুজিবনগর) এক আমবাগানে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার। এই আমবাগানকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়।

Comments
Comments