ছয়জনের জন্য ২ হাজার টাকায় ঈদবাজারে তাঁরা
![]() |
| ছোট শিশুর জন্য কারওয়ান বাজারে জুতা কিনছে এই পরিবার। গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ২ নম্বর সুপার মার্কেটের প্রবেশমুখে জুতার অস্থায়ী দোকানগুলোতে ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত এক পরিবার। বয়স্ক নারী রাহিমার কোলে তাঁর কয়েক মাস বয়সী নাতি, আর পাশে তাঁর বড় ছেলের বউ আঁখি ও ১০-১১ বছরের নাতনি।
গতকাল রোববার তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা বেগুনবাড়ির সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল এলাকায় ভাড়া থাকেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন, কিন্তু ঈদের কেনাকাটার জন্য তাঁদের মোট বাজেট মাত্র ২,০০০ টাকা। বাজার ঘুরে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, এই সামান্য টাকায় সবার জন্য কেনাকাটা সম্ভব নয়। তাই আগে শিশুদের জন্যই জুতা কেনা শুরু করেছেন।
রাহিমা জানান, ১২-১৩ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন। তাঁর বড় ছেলে উমর হোসেন একটি রিকশা গ্যারেজে ৬,০০০ টাকা বেতনে কাজ করেন। অভাবের তাড়নায় তাঁর ১৬ বছর বয়সী ছোট ছেলেকেও কাজে পাঠাতে হয়েছে, যে একটি অফিসে ১০,০০০ টাকা বেতনে পিয়নের কাজ করে। তবে ছোট ছেলে এখনো এই মাসের বেতন পায়নি।
বড় ছেলের দেওয়া ২,০০০ টাকা নিয়ে বাজারে আসা রাহিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সবার জন্য তো আর কেনাকাটা হইব না। নাতি-নাতনির জন্য জুতা কেনার পর যা থাকে, তা দিয়ে বাকিটা দেখব। আমি বলেছি, আমার জন্য কিছু লাগবে না।
![]() |
| মেয়ের জন্য বোরকা কিনছেন এই মা। গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
শিশুদের মা আঁখি জানালেন, জামা এখনো কেনা হয়নি। সাধ্যের মধ্যে সন্তানদের জন্য কিছু করতে পারলেই তিনি খুশি। নিজের জন্য মাত্র ১৫০ টাকা দিয়ে এক জোড়া স্যান্ডেল কিনলেও মেয়ের শখ মেটাতে ৫০০ টাকা দিয়ে এক জোড়া উঁচু হিলের জুতা কিনেছেন। মেয়েটির বায়না সে ঈদে লেহেঙ্গা পরবে, আর তার সঙ্গেই এই জুতা পরতে চায়। জুতা কেনা হলেও লেহেঙ্গা বা জামা হবে কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত নন মা আঁখি।
জুতা কিনতেই তাঁদের দুই হাজার টাকা বাজেটের বড় একটি অংশ শেষ হয়ে গেছে। এখন সেই টাকা দিয়ে স্বামী, শাশুড়ি আর ছোট সন্তানের জন্য জুতা কেনা সম্ভব কি না, তা-ই দেখছেন তিনি।
কারওয়ান বাজারের ভেতরে এমন অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারকে ঈদের কেনাকাটা করতে দেখা যায়। এক শ্রমজীবী নারী তাঁর ভাবির জন্য ৭০০ টাকা দিয়ে একটি থ্রি-পিস কিনেছেন। অন্য একটি দোকানে দুই শিশুকে নিয়ে আসা এক নারীকে দামী কারুকাজ করা জামা বাদ দিয়ে সুতির সাধারণ পোশাক দেখতে বলেন তাঁর সঙ্গী। সেখানে ১,৪০০ টাকা দামের একটি ছোটদের টু-পিস ৮০০ টাকায় বনিবনা না হওয়ায় তাঁরা অন্য দোকানে চলে যান।
'ব্রাদার্স পয়েন্ট' দোকানের মালিক কাওছার আহাম্মেদ খান জানান, ঈদ উপলক্ষে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা থাকে। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষরাই এখানে কেনাকাটা করতে আসেন এবং তাঁর দোকানে ১৫০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে পোশাক পাওয়া যায়।
'মায়ের আঁচল শাড়ি বিতান' দোকানে দেখা হয় পারভীন নামে এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি টঙ্গী থেকে এসেছেন আগের দিন কেনা বড় মেয়ের বোরকা ও জুতা বদলে নিতে, কারণ সেগুলো মাপে ছোট হয়েছিল। পারভীন জানান, এক যুগ আগে তাঁর স্বামীর ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। গত মাসেই তাঁর বড় মেয়ের স্বামী হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এখন সেই বিধবা মেয়ে ও তাঁর ১৩ বছরের নাতনি পারভীনের বাসাতেই থাকছেন।
![]() |
| শখ আর বাজেট মেলানোর চেষ্টা চলছে। গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
পারভীন জানান, তাঁর বড় ছেলে টঙ্গীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। মেজ মেয়ে বাড়িতে কাপড় সেলাই করে সামান্য আয় করেন এবং ছোট মেয়েটি কলেজে পড়ে। তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছোট ছেলেটি মাদ্রাসায় পড়ত, কিন্তু অভাবের কারণে তাকে একটি হোটেলে কাজে দিয়েছিলেন। সেখানে গরম তরকারির হাঁড়ি ওঠাতে গিয়ে ছেলেটি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়। দীর্ঘ দেড় মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর সে এখন বাড়িতে আছে, তবে প্রতিদিন তাঁর ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করাতে হয়।
ছেলের চিকিৎসার জন্য হোটেলের মালিক ও আত্মীয়স্বজনরা সাহায্য করেছেন। এমন টানাটানির মধ্যেও পারভীন তাঁর সদ্য বিধবা মেয়ের জন্য একটি বোরকা ও এক জোড়া জুতা কিনেছেন। এছাড়া পরিবারের আর কারও জন্য, এমনকি তাঁর কিশোরী নাতনির জন্যও কোনো কেনাকাটা করতে পারেননি। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, "মেয়ের জন্য এইটুকু কিনতে পারাই এখন আমার কাছে অনেক বড় বিষয়। একসময় অবস্থা ভালো ছিল, স্বামী আমাদের অনেক ভালো ভালো পোশাক কিনে দিতেন, এখন আর তা সম্ভব হয় না।"
মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার কথা ভেবেই তিনি কষ্ট করে এই নতুন বোরকাটি কিনে দিয়েছেন, কারণ আগেরটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কারওয়ান বাজার থেকে বের হওয়ার সময় এমন আরও অনেক মানুষকে দেখা গেল, যারা নিজেদের সাধ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রিয়জনদের জন্য কেনাকাটা করছেন। হয়তো তাঁদের সবারই নিজের শখ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের অন্তত একজনের মুখে হাসি ফোটানোর এক একটি সংগ্রামের গল্প রয়েছে।



Comments
Comments