মনের প্রশান্তি ও সুস্থতায় এক খণ্ড সবুজ
| সবুজ প্রকৃতি মানুষের রাগ, হতাশা ও মানসিক অবসাদ কমিয়ে দেয়। মডেল: সাবরিনা বিনতে মাহবুব | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ব্যস্ত নগরজীবনে আমাদের বেশির ভাগ সময় কাটে ঘরের ভেতরের কৃত্রিম আলোয়। সারাক্ষণ কম্পিউটার, ট্যাব বা মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এই যান্ত্রিকতায় মন প্রায়ই হাঁপিয়ে ওঠে, অনেকে অসুস্থও হয়ে পড়ছেন। এমন সময়ে মন খুঁজে বেড়ায় একটুখানি সবুজ—হোক তা বিশাল কোনো মাঠ, দূরের ঘন বন কিংবা বারান্দার ছোট বাগান। কারণ, সবুজই আমাদের মনে প্রশান্তি আনে আর শরীরকে রাখে সুস্থ।
| নাগরিক ব্যস্ততায় মন খুঁজে বেড়ায় এক খণ্ড সবুজ। মডেল: সাবরিনা বিনতে মাহবুব | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সবুজ প্রকৃতি যেভাবে আমাদের ভালো রাখে:
১. যাঁরা পাহাড়ে চড়েন, তাঁরা বলেন, এক ঘণ্টা যন্ত্রে (ট্রেডমিল) হাঁটার চেয়ে এক ঘণ্টা পাহাড়ে চড়া কম ক্লান্তিকর। কারণ, প্রাকৃতিক পরিবেশের সবুজ আর নির্মল বাতাস মানুষকে সহজে ক্লান্ত হতে দেয় না। এতে শরীরের মানসিক চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ নিঃসরণ কমে, ফলে উদ্বেগ ও ক্লান্তিভাবও দূর হয়।
২. সবুজ প্রকৃতি মানুষের রাগ, হতাশা ও মানসিক বিষণ্নতা কমিয়ে দেয়। এতে ইতিবাচক চিন্তা করার শক্তি বাড়ে এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়ার সমস্যা কমে আসে।
৩. কৃত্রিম আলোয় চোখের মাংসপেশিতে চাপ বেশি পড়ে, ফলে চোখ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পেশিগুলো আরাম পায়। এটি চোখের দৃষ্টির সমস্যা বা কাছের জিনিস দেখতে না পাওয়ার (মায়োপিয়া) ঝুঁকি থেকেও বাঁচায়।
| সবুজ গাছপালা ও নির্মল বাতাস শুধু আমাদের পরিবেশের জন্যই প্রয়োজনীয় নয়, আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্যও দরকারি। মডেল: সাবরিনা বিনতে মাহবুব | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
৪. সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকলে আমাদের মনোযোগ বাড়ে এবং সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। তাই যাঁরা প্রকৃতির মাঝে বেশি সময় কাটান, তাঁদের ভুলে যাওয়ার রোগ বা স্মৃতিভ্রম হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এ ছাড়া সবুজের কাছাকাছি থাকলে সিজোফ্রেনিয়া, মনোযোগের ঘাটতি ও মেজাজ খিটখিটে হওয়ার মতো মানসিক সমস্যা কম হয়।
৫. ঘরের ভেতরের বদ্ধ বাতাস আমাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এতে অ্যালার্জি ও ফুসফুসের সমস্যা বেড়ে যায়, যা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। প্রকৃতি ও সবুজ গাছপালা স্বাভাবিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এটি অনিদ্রা দূর করে এবং কাজের শক্তি জোগায়।
৬. পার্কে যখন অনেক মানুষ একসঙ্গে হাঁটেন বা গল্প করেন, তখন নিজেদের মধ্যে যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়, তেমনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরল বৃদ্ধি ও স্থূলতার মতো শারীরিক সমস্যাগুলোও কমে আসে।
কীভাবে থাকবেন সবুজের সংস্পর্শে?
সবুজ গাছপালা ও নির্মল বাতাস শুধু পরিবেশের জন্যই নয়, আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্যও খুব জরুরি। যাঁরা পাথরের গুণাগুণে বিশ্বাস করেন, তাঁরা সবুজ পান্নাকে রোগ সারিয়ে তোলার পাথর হিসেবে গণ্য করেন। আমরা আমাদের দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য কিছু পরিবর্তন এনেই সবুজের কাছাকাছি থাকতে পারি।
১. সপ্তাহের ছুটির দিনে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। পরিবারের ছোট সদস্যদের নিয়ে কাছাকাছি কোনো সবুজ মাঠ, নদীর তীর কিংবা পাহাড় থেকে ঘুরে আসা যায়।
২. বাসার ছাদে অথবা ছোট্ট বারান্দায় বাগান করা যেতে পারে। এতে যেমন অবসর সময় কাটবে, তেমনি শরীর ও মন ভালো থাকবে। এ ছাড়া ঘরের কোণে বা জানালার পাশে ছোট ছোট ইনডোর প্ল্যান্ট বা গৃহস্থালি গাছ রাখা যায়। এতে ঘরটি সবুজে ছেয়ে যাবে।
| সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকলে আমাদের মনোযোগ বাড়ে, বৃদ্ধি পায় সৃজনশীলতা। মডেল: সাবরিনা বিনতে মাহবুব | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
৩. কর্মস্থলে নিজেদের বসার জায়গায় ছোট ছোট সবুজ গাছ রাখা যেতে পারে। কাজের টেবিলটি জানালার পাশে রাখা ভালো, যাতে কাজের চাপে চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়লে কিছু সময়ের জন্য জানালার বাইরে তাকালে আরাম পাওয়া যায়।
৪. বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার জন্য রেস্তোরাঁ বেছে না নিয়ে কোনো খোলা জায়গা বা সবুজ পার্ক বেছে নেওয়া যেতে পারে। এটি ক্লান্তি কাটিয়ে আপনাকে সতেজ হতে সাহায্য করবে।
লেখক: স্পেশালিস্ট (ইন্টারনাল মেডিসিন), স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা।
Comments
Comments