রূপপুরে চুল্লিতে দেওয়া হলো ইউরেনিয়াম, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ
পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করল। সেই সঙ্গে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় নাম লেখাল বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার বিকেলে প্রকল্প এলাকায় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এই প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা—রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসির ধারণ করা বক্তব্য প্রচার করা হয়।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের কাজ উদ্বোধন করেন।
অবশ্য এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ বা আগস্টের শুরুতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে পারে। শুরুর দিকে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।
জ্বালানি স্থাপনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, বাংলাদেশ এখন সেই দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো, যারা টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে। তিনি জানান, রূপপুর প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে একটি আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পেরে রোসাটম গর্বিত। ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রথম ইউনিটের জ্বালানি স্থাপন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বর্তমানে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি অপরিহার্য। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেই চাহিদা পূরণ করবে। এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই করবে না, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে স্থায়ী রূপ দেবে এবং বাংলাদেশকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পথে এগিয়ে নেবে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত এই প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের মূল অবকাঠামোর ঢালাই কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৪ জুলাই। দুটি ইউনিটের কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ জোগান দেবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের পর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে। প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণ সক্ষমতার ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
এদিকে একই ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি স্থাপনের কাজ চলতি বছরের শেষের দিকে শুরু হতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রাথমিক অর্থনৈতিক আয়ু ধরা হয়েছে ৬০ বছর, যা পরবর্তী সময়ে আরও ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে একটি কার্যক্রম-পূর্ব নিরাপত্তা পর্যালোচনা পরিচালনা করে। এতে কেন্দ্রের নিরাপত্তা মান ও পরিচালনা পদ্ধতি যাচাই করা হয়।
Comments
Comments