[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

দেশে জ্বালানি তেলের মজুত কতটা, আতঙ্কের কেনাকাটা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশঃ
অ+ অ-
জ্বালানি তেলের জন্য গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেলচালকদের অপেক্ষা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন   

দেশে গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে। সেই হিসাবে দিনে অকটেনের গড় চাহিদা ১ হাজার ১০০ টন। তবে ‘আতঙ্কের কেনাকাটা’ বা প্যানিক বায়িংয়ের কারণে ১ থেকে ৪ মার্চের হিসাবে দৈনিক চাহিদা ২ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে।

জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহকারী সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র বলছে, এই বাড়তি চাহিদার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এত বেশি হারে তেল সরবরাহ করা হলে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাবে এবং মজুতকারীরা লাভবান হবে। এ কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বছরের এই সময়ে যে ফিলিং স্টেশন যতটুকু তেল নিয়েছে, এবার তার চেয়ে ২৫ শতাংশ কম দেওয়া হবে।

বিপিসি গত শুক্রবার ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে তেল বিক্রির সীমা বেঁধে দিয়েছে। এখন থেকে একটি মোটরসাইকেল দিনে ২ লিটার এবং প্রাইভেট কার ১০ লিটার তেল পাবে। বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও তেলের সীমা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।

বিপিসি সূত্র জানায়, আজ থেকে দিনে ৯১৩ টন করে অকটেন সরবরাহ করা হবে। গতকাল শনিবারের হিসাব অনুযায়ী, অকটেনের মজুত আছে ২৩ হাজার ৫৫ টন। দিনে ৯১৩ টন করে দিলে এই তেল দিয়ে ২৫ দিনের মতো চলা যাবে। পাশাপাশি দেশি উৎস থেকে এই মাসেই ২৫ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। আরও ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির উৎস খুঁজছে বিপিসি।

সব মিলিয়ে ৫০ হাজার টন অকটেন মজুতে যুক্ত হলে তা দিয়ে ৪৪ দিন চলা যাবে (যদি দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ১৩৬ টন ধরা হয়)।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘মজুত আছে, কিন্তু যুদ্ধ কবে থামবে তা আমরা কেউ জানি না। আগে থেকে তো ঘর ঠিক করতে হবে, সঞ্চয় রাখতে হবে। সেই জন্যই আমরা এই সঞ্চয় করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘৯ তারিখ আমাদের আরও দুটি জাহাজ আসছে, তাই ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যেহেতু যুদ্ধ চলছে, আমাদের খুব হিসাব করে চলতে হবে।’

মন্ত্রী এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করেছে। ইরানও এর পাল্টা জবাব দিচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে এবং দাম বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে ‘আতঙ্কের কেনাকাটা’ শুরু হয়েছে। মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি তেল কিনছে। এতে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরকারি মজুত কমে যাচ্ছে।

গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালাতে অকটেন ও পেট্রল ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, অকটেনের ৫০ শতাংশ এবং পেট্রলের ১০০ শতাংশই দেশে উৎপাদিত হয়। তাই পেট্রল ও অকটেন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

সরকারি তেল শোধনাগার থেকে কোনো অকটেন পাওয়া যায় না। তবে আমদানির বাইরে দেশের চারটি বেসরকারি শোধনাগার থেকে নিয়মিত অকটেন কেনে বিপিসি। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া এবং আমদানি করা ‘কনডেনসেট’ শোধন করে অকটেন ও পেট্রলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল উৎপাদন করা হয়। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই কনডেনসেট আমদানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

দেশে গত অর্থবছরে ৪ লাখ ৬২ হাজার টন পেট্রল বিক্রি হয়েছে, যার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত। পেট্রলের ১৬ শতাংশ এসেছে চট্টগ্রামের সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) থেকে এবং বাকি ৮৪ শতাংশ এসেছে বেসরকারি শোধনাগার থেকে। এ বছরও পেট্রল আমদানির কোনো পরিকল্পনা নেই বিপিসির; দেশীয় উৎপাদন থেকেই চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

প্রতিবছর ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পেট্রল, ডিজেল ও ফার্নেসসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করে ইআরএল। আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে এই তেল আমদানি করা হয়। যুদ্ধের কারণে বর্তমানে আমদানি বন্ধ থাকলেও ইআরএলে দেড় লাখ টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে। দিনে গড়ে ৪ হাজার টন তেল শোধন করার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। নতুন করে আমদানি না হলেও আগামী মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইআরএলে উৎপাদন চালানো যাবে।

বিপিসি সূত্র জানায়, দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন। তবে ১ থেকে ৪ মার্চের হিসাবে এই চাহিদা বেড়ে ২ হাজার ৩০০ টন ছাড়িয়েছে। বিপিসির গতকালের হিসাব অনুযায়ী, পেট্রলের মজুত আছে ১৫ হাজার ৫১৭ টন। আজ থেকে দিনে ১ হাজার ৭০ টন করে পেট্রল সরবরাহ করা হবে। এই মজুত দিয়ে ১৫ দিন চলা যাবে। তবে ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) থেকে প্রতিদিন ৪০০ টন করে পেট্রল পাওয়া যাবে। এছাড়া বেসরকারি শোধনাগার থেকেও নিয়মিত সরবরাহ আসবে।

বিপিসির হিসাবে, এই মাসে দেশের সরকারি ও বেসরকারি শোধনাগার থেকে পেট্রল ও অকটেন মিলিয়ে ৪০ হাজার টন তেল আসতে পারে। তাই আপাতত মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং নতুন করে আমদানি করা না গেলে ইআরএলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। সেই হিসাবে দিনে চাহিদা প্রায় ১২ হাজার টন। তবে ১ থেকে ৪ মার্চের হিসাবে এই চাহিদা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টন। আজ থেকে দিনে ৯ হাজার ২২ লিটার করে ডিজেল সরবরাহ করা হবে। নতুন একটি জাহাজ আসার পর গতকাল পর্যন্ত ডিজেলের মজুত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৮৮৬ টন, যা দিয়ে ১৮ দিন চলা সম্ভব।

এদিকে বিপিসি জানিয়েছে, ১৩ মার্চের মধ্যে ডিজেল নিয়ে আরও পাঁচটি জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ওই জাহাজগুলোতে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল আছে, যা দিয়ে আরও ১২ দিন চলবে (দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টন ধরে)। এছাড়া দেশি শোধনাগার থেকে এই মাসেই আরও ৫০ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যাবে।

দেশে মোট ডিজেল সরবরাহের ১৮ শতাংশ আসে ইআরএল থেকে। অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বন্ধ থাকলে আগামী মাসে ডিজেল উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। বিপিসি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের জ্বালানি চাহিদার ৭০ শতাংশই ডিজেল। যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেলবাহী কয়েকটি জাহাজের শিডিউল কয়েক দিন করে পিছিয়ে গেছে। জাহাজ আসতে দেরি হওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৪ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে আরও ১১টি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যাতে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল থাকবে। এই জাহাজগুলো আসার সময় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এগুলো সময়মতো পৌঁছাতে পারলে ডিজেলের কোনো সংকট হবে না।

সব মিলিয়ে গত অর্থবছর দেশে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আমদানিকৃত পরিশোধিত তেল ছিল ৪৬ লাখ ৮ হাজার টন এবং দেশি শোধনাগার থেকে এসেছে ১৯ লাখ ৩৬ হাজার টন।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক দিনে দ্বিগুণ পরিমাণে তেল বিক্রি হয়েছে। তাই অপচয় ও পাচার রোধে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন। এখন থেকে শনিবারেও ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহের কথা ভাবা হচ্ছে। 

এদিকে গতকাল তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় ঢাকার বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন সকাল ও দুপুরের পর বন্ধ হয়ে যায়। ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতি জানিয়েছে, সাধারণত প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকে। গত কয়েক দিন ধরে অস্বাভাবিক হারে তেল বিক্রি হওয়ায় গতকাল অনেক স্টেশনের তেল শেষ হয়ে গেছে। বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার শনিবারও তেল সরবরাহের অনুরোধ করা হলেও বিপিসি তাতে রাজি হয়নি। আজ রোববার সকালে ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করার পর দুপুর থেকে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো আবার তেল বিক্রি করতে পারবে।

পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, দেশে পেট্রল ও অকটেনের সংকট হওয়ার কথা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ ভিড় করছে। তিনি মনে করেন, শনিবার বিপিসি তেল সরবরাহ করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমত। সরকারের বেঁধে দেওয়া সীমা মেনেই সবার তেল বিক্রি করা উচিত। যারা এই নিয়ম মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে বিপিসি ব্যবস্থা নিতে পারে।

অন্যদিকে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ৭০ ডলার থেকে বেড়ে ৯০ ডলার ছাড়িয়েছে। সরকারকে এই বাড়তি দামেই তেল কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সংকট মেটাতে চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) কেনা হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। তাই সরকার আগেভাগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, যুদ্ধ চলায় তেলের ঘাটতি হতে পারে ভেবে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বেশি তেল কিনছে। তবে তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় মানুষের মনে ভয় আরও বাড়তে পারে। তিনি মনে করেন, ভয়ের কোনো কারণ নেই—এই বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে প্রচার করা দরকার। মজুত করা তেল বেশি দিন চালিয়ে নিতেই সরকার সরবরাহ কমাচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষেরও উচিত তেলের ব্যবহার কমিয়ে আনা। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন