বাবা ছাড়া দুই শিশুসন্তানের কষ্টের ঈদ
![]() |
| মায়ের সঙ্গে শিশু আবদুল্লাহ আবরার আয়ান। বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলী নতুন আইলপাড়া এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
এক দিন পর পবিত্র ঈদুল ফিতর। চারদিকে উৎসবের আমেজ, নতুন পোশাকের জন্য আনন্দ, ঘরে ঘরে ব্যস্ততা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলী নতুন আইলপাড়া এলাকায় প্রয়াত আবুল কালামের পরিবারে নেই কোনো ঈদের আনন্দ। আবুল কালামকে ছাড়া পরিবারে এটি প্রথম ঈদ। কারও মনে নেই আনন্দের ছোঁয়া। বাবাকে ছাড়া দুই শিশুসন্তানের প্রথম ঈদ কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বছরের ২৬ অক্টোবরে রাজধানীর ফার্মগেইট এলাকায় মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে পথচারী আবুল কালাম প্রাণ হারান।
আইরিন আক্তার প্রিয়া, তার চার বছর বয়সী ছেলে আবদুল্লাহ আবরার আয়ান ও তিন বছর বয়সী মেয়ে পারিশা মারিয়াম সুরার সঙ্গে আবুল কালামের সংসার ছিল। তিনি রাজধানীর মতিঝিলে একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করতেন। হঠাৎ দুর্ঘটনায় আইরিনের সংসারের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের জলিল চোকদার ও হনুফা দম্পতির ছেলে আবুল কালাম কিশোর বয়সে তার মা-বাবাকে হারান। ভাইবোনদের সংসারে বড় হয়েছেন। আবুল কালামের শ্বশুর আরব আলী ইতালিতে বসবাস করেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নতুন আইলপাড়া এলাকায় ভাড়া বাড়িতে আবুল কালামের স্ত্রী আইরিন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করতেই তার চোখ জলে ভরে ওঠে। কণ্ঠে চাপা কষ্টে তিনি বলেন, ঈদে বাবা বাচ্চাদের সঙ্গে মার্কেটে যেতেন, নতুন জামা কিনে দিতেন, দুপুরের খাবারের পর বাইরে ঘুরতাম। এবার তারা বাবাকে ছাড়া প্রথম ঈদ করবে—এটা মেনে নেওয়া খুব কষ্টের।
আইরিন জানান, এবারের ঈদে ছেলে আবদুল্লাহ আবরারের জন্য প্যান্ট, গেঞ্জি ও জুতা এবং মেয়ে পারিশা মারিয়াম সুরার জন্য নতুন জামা ও জুতা কেনা হয়েছে। তবু আনন্দ নেই। ছেলে আগে বাবার জন্য খুব কান্নাকাটি করত, এখন কিছুটা কমেছে। কিন্তু মেয়ে এখনও বাবাকে খুঁজে বেড়ায় এবং ঘুমের ভেতরেও বাবার জন্য কেঁদে ওঠে।
স্বামী আবুল কালাম গরুর মাংস, খিচুড়ি ও সেমাই পছন্দ করতেন। ঈদের দিন তার পছন্দের খাবার রান্না করা হতো। আইরিন জানান, এবারও রান্না হবে, কিন্তু সেই খাবারে আগের মতো আনন্দ থাকবে না।
আইরিন বলেন, ‘গত ঈদে আমরা সবাই একসঙ্গে খেয়েছি, ঘুরতে গিয়েছিলাম। এবার সবই হবে, কিন্তু সে তো আর নেই। এই প্রথম ঈদে সন্তানরা বাবাকে ছাড়া ঈদ করবে। এটা আমার ও তাদের জন্য অনেক কষ্টের।’
দুর্ঘটনার পর মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ পরিবারটিকে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেল কার্যালয়ে আইরিনকে অর্থ সহকারী পদে চাকরি দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন এই চাকরি তার জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে।
আইরিনের মা রিনা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই ছোট বাচ্চাকে বাসায় রেখে মেয়েকে অফিসে যেতে হয়। ওরা মাকে ছাড়া থাকতে পারে না। সারা দিন কান্না করে। বাবা তো নেই, মাকেও কাছে পায় না—এটা বাচ্চাদের জন্য খুব কঠিন।’ তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ আবুল কালামের দুই সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু তাদের জন্য কিছু করা হয়নি। শুধু এককালীন পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে এবং মেয়েকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। তবে বেতনের আয়ের সঙ্গে সংসার চালানো খুব কঠিন। সরকারের প্রতি তার আহ্বান, সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য এককালীন অর্থ সহায়তা দেওয়া হোক, যাতে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে।
আইরিন বলেন, ‘আমার ছোট সন্তান দুটিকে সঙ্গে নিয়ে যদি অফিস করতে পারতাম, তাহলে স্বস্তি পেতাম। ওরা বাবাকে হারিয়েছে, আমার ছাড়া ওদের কেউ নেই। কর্তৃপক্ষ যদি ছোট বাচ্চাদের কর্মস্থলে রাখার অনুমতি দিত, তাহলে তারা বাবাকে হারালেও মাকে সারাক্ষণ কাছে পেত।’

Comments
Comments