সময়ের প্রবাহে পাল্টে গেছে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য
| রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সম্ভবত এক বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবেন। তিন বছরের কম সময়ের মধ্যে তিনি তিনটি ভিন্ন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতিটি সরকারের সময়ই তাদের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ এই সরকারগুলোর রাজনৈতিক আদর্শ ও ধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানের মুখে সেই সরকারের পতন ঘটে। এরপর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল ছিলেন। ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্য উপদেষ্টাদের শপথ পড়িয়েছিলেন তিনি। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া যেসব ছাত্রনেতা উপদেষ্টা হয়েছিলেন, তাঁদের শপথও তাঁর হাতেই নিতে হয়। অথচ এই ছাত্রনেতারা শুরু থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মাধ্যমে এখন সরকার গঠন করেছে বিএনপি। বর্তমানে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তিন বছর আগে যে দল মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল, সেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ।
দেশের এই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণ এখন আলোচনার মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
![]() |
| ২০২৩ সালের ২০ মে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা | ফাইল ছবি |
যাঁকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই রাষ্ট্রপতির ভাষণে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা গেছে। তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
একসময় যাঁকে শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতে দেখা যেত, সেই রাষ্ট্রপতি এবার ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি শেখ হাসিনার শাসনকালকে স্বৈরাচারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সেই সরকারের পতন ঘটেছে এবং হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের কথাও তাঁর ভাষণে উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি যখন সাবেক সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের কথা বলছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়ে সমর্থন দিতে দেখা যায়। তবে রাষ্ট্রপতির এই ভাষণের সময় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যান।
রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের সঙ্গে দুই বছর আগের অবস্থানের চরম বৈপরীত্য লক্ষ করা গেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তখন বিএনপি ও জামায়াতের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেছিলেন, একটি মহল সহিংসতা ছড়িয়ে গণতন্ত্রের পথে বাধা দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে।
সে সময় বিতর্কিত ওই নির্বাচন সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই নির্বাচন সফল হয়েছে এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ সার্থক হয়েছে। গতবার তিনি বক্তৃতা শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ বলে; আর এবার শেষ করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে বিতর্কের একটি অন্যতম কারণ হলো এর প্রকৃতি। সাধারণত এই ভাষণ রাষ্ট্রপতি নিজে লেখেন না; এটি সরকার বা মন্ত্রিসভা তৈরি করে দেয়। রাষ্ট্রপতি কেবল সংসদে তা পাঠ করেন এবং পরে সেটির ওপর আলোচনা হয়। তবে এবারের সংসদ এক ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে। বহু প্রাণের বিনিময়ে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে এই সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
সংসদ নেতা তারেক রহমানও বলেছেন, জাতীয় সংসদ হবে রাষ্ট্রের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ কি কেবল সরকারের লিখে দেওয়া বক্তব্যই থাকবে, নাকি সেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারীর নিজস্ব অবস্থানের প্রতিফলনও ঘটবে?
মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করা নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনা ছিল। তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ পদ থেকে অবসরে যান এবং ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন।
![]() |
| অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ৮ মার্চ, ২০২৪ | ফাইল ছবি |
দুদকে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। পরবর্তীতে তিনি দেশের আর্থিক খাতের আলোচিত এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও সহসভাপতি হন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জেএমসি বিল্ডার্সের শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করে রেখেছে। এ ছাড়া তিনি এস আলম-সংশ্লিষ্ট এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এসব কারণে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করার পর কোনো কোনো মহলে এমন আলোচনাও ছিল যে, তিনি ‘এস আলমের রাষ্ট্রপতি’। তাঁকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়টি তখন আওয়ামী লীগের নেতা–মন্ত্রীদের জন্যও ছিল এক বিরাট বিস্ময়। এমনকি দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা ওঠে যে, মো. সাহাবুদ্দিন দুই বোন—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পছন্দেই রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মো. সাহাবুদ্দিন এখনো রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আছেন। তবে বিএনপি সরকার তাঁকে কত দিন স্বপদে রাখবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। সংসদ অধিবেশন বসার আগেই এনসিপি তাঁর অপসারণের দাবি তুলেছিল।
গতকাল সংসদে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় মুখ্য সচেতক নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো স্বৈরাচার বা তাঁর সহযোগীরা যেন বক্তব্য দিয়ে সংসদকে কলুষিত করতে না পারেন।
তবে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার গতকাল ফেসবুকে এক পোস্টে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে উপদেষ্টা হিসেবে নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার শপথ নেওয়ার ছবি শেয়ার করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘উপদেষ্টা হওয়ার সময় সহযোগীকে ভালো লাগে, এখন লাগে না।’
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ প্রদানের জন্য আমন্ত্রণ জানালে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদী বক্তব্যসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করেন। ১২ মার্চ, ২০২৬ছবি: বিটিভির সৌজন্যেজামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান এই রাষ্ট্রপতিকে ‘স্বৈরাচারের সহযোগী’ ও ‘খুনির সহযোগী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জানিয়েছিলেন যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে দুটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেই কথা অস্বীকার করে নতুন গল্প সামনে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতির কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ সাধারণত সংসদের একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও এবারের ভাষণ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ কি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে? এই ধারা চলতে থাকলে মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদা কতটুকু বাড়বে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।



Comments
Comments