[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বরিশালে সারের বাড়তি দাম ও সেচ খরচ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
বোরো খেতের আগাছা পরিষ্কার করছেন এক কৃষক। রোববার দুপুরে বরিশাল সদরের কাশীপুরের করমজা এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

বরিশালে বোরো মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। এতে চাষের খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। সারের পাশাপাশি সেচ ও কীটনাশকের বাড়তি খরচ মিটিয়ে লাভের কোনো আশা দেখছেন না তারা। ফলে অনেক কৃষক বোরো চাষের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। গত রোববার বরিশালের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের চিনিবাড়ী গ্রামের কৃষক মো. সেলিম এবার ২৫ একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি জানান, লাভ কম হওয়ায় এলাকার অনেকেই এবার আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ চাষই করছেন না। সেচ, সার ও ওষুধের যে দাম, তাতে এখন খরচ জোগানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোরো মৌসুমে জমিতে প্রচুর পরিমাণে ইউরিয়া ও ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সারের প্রয়োজন হয়। কৃষকদের এই সার কিনতে হয় ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে। বড় চাষিরা জানান, ডিলারদের কাছ থেকে তারা প্রতি ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়া কিনছেন ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। আর এক বস্তা ডিএপি কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ টাকায়। এতে প্রতি কেজি ইউরিয়ার দাম পড়ছে ২৯ টাকা এবং ডিএপি ২৫ টাকা। অথচ সরকার ইউরিয়া সারের দাম প্রতি কেজি ২৭ টাকা এবং ডিএপি ২১ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্থানীয় বাজার বা সাব-ডিলারদের কাছ থেকে কিনলে দাম আরও বেশি পড়ে।

বরিশালের আগৈলঝাড়া ও উজিরপুরের ধামুরা এলাকায় প্রায় ২৫ একর জমিতে বোরো চাষ করছেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৪৬০ টাকা ও ডিএপি ১ হাজার ২৫০ টাকায় কিনতে হয়। সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি দিয়ে এখন আর বোরো চাষে লাভ হয় না। শুধু দীর্ঘদিনের পেশা বলে ছাড়তে পারছেন না।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ২ লাখ ৫ হাজার ৩৮৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে। বরিশাল জেলায় আবাদ হয়েছে ৬২ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে।

গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, আগৈলঝাড়া ও উজিরপুরের অনেক এলাকায় চারা রোপণ শেষ হয়েছে, আবার কোথাও কাজ চলছে। কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করলেও সব খরচ মিটিয়ে লাভ হবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

বরিশাল সদরের করমজা এলাকার কৃষক গিয়াস উদ্দিন এবার সাত একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি একরে এবার ৩০ হাজার টাকা খরচ হবে, কিন্তু সেই পরিমাণ ধান উঠবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই।

গিয়াস উদ্দিনের অভিযোগ, পাম্প থেকে কৃষকদের কাছে ডিজেল বিক্রি করা হয় না। বাইরে থেকে বেশি দামে ডিজেল কিনতে হয়, আবার মাপেও কম দেওয়া হয়। তিনি জানান, দুজন সার ডিলারকে ফোন দিলে তারা জানান সারের সরবরাহ নেই। ফলে বাইরে থেকে বেশি দামে সার ও তিন-চার গুণ বাড়তি দামে কীটনাশক কিনতে হচ্ছে। সরকার বা কৃষি অফিস এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আবদুল বারেক নামের আরেক কৃষক তাঁর বোরো খেতে আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। কাজের ফাঁকে তিনি জানান, এখন আর আগের মতো বেশি জমিতে বোরো চাষ করেন না; শুধু নিজেদের খাওয়ার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই চাষ করছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি ও চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে, সারের দামও চড়া, কিন্তু সেই তুলনায় ফলন কম। কৃষিতে এখন আর লাভ নেই। দীর্ঘদিনের পেশা বলেই কোনোমতে টিকে আছেন। তিনি জানান, ১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি সার তাঁকে ১ হাজার ২৫০ টাকায় এবং ১ হাজার ২৫০ টাকার ইউরিয়া ১ হাজার ৪৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

তবে দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বরিশাল অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক (সার ও বীজ) মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত সার আছে, এমনকি রাখার জায়গারও অভাব নেই। সরকার প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ২৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে।’ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ দেখাশোনা করে, তাই এ নিয়ে তিনি কিছু বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বরিশাল বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমি সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নেব। অভিযোগের সত্যতা পেলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বাবার কৃষিকাজে সহযোগিতা করে নবম শ্রেণির ছাত্র রাফি সরদার। সার কিনতে গিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে সে বলে, ‘বাবা গত শনিবার দেড় হাজার টাকা দিয়ে আমাকে সার কিনতে পাঠান। এক বস্তা ইউরিয়া ও পাঁচ কেজি ডিএপি সার কেনার কথা ছিল। কিন্তু ডিলারের কাছে যাওয়ার পর তিনি এক বস্তা ইউরিয়ার দামই চাইলেন ১ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে বাধ্য হয়ে আবার বাড়ি গিয়ে বাড়তি টাকা নিয়ে আসতে হয়েছে।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন