সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা করা প্রয়োজন, সেনাবাহিনী তা-ই করবে: সেনা সদর
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে অসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা এবং জনগণের মনে আস্থা ফেরাতে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনা সদর থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগে ও পরে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সেনাবাহিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করবে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানের রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ‘বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা’ (ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার) কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন সম্মেলনে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়াই এই সংবাদ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।
সেনা সদরের এই সংবাদ সম্মেলনের আগে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। একই সঙ্গে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত সমন্বয় সভায় অংশ নেন।
সংবাদ সম্মেলনে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন এই নির্বাচন আয়োজনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রধান মন্ত্রণালয় হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। সে অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচন-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব স্পষ্টভাবে বলা আছে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ভোটের আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই সেনা কর্মকর্তা আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১০ জানুয়ারি থেকে মাঠপর্যায়ে সেনা সদস্যের সংখ্যা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার করা হয়েছে। ২০ জানুয়ারি তা এক লাখে উন্নীত করা হয়। পাশাপাশি নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬২ জেলায়, ৪১১টি উপজেলায় এবং মহানগরগুলোতে মোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করেছে। নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান ও তল্লাশি চৌকির (চেকপোস্ট) মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারের হারও বেড়েছে বলে জানান দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, ২০ জানুয়ারি থেকে গত ১৪ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার অধিকাংশই দেশি–বিদেশি পিস্তল। এ ছাড়া গোলাবারুদ, ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। ৩১ জানুয়ারি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় যৌথ অভিযানে চারটি বিদেশি পিস্তল ও ১০টি গ্রেনেডের মতো হাতবোমা উদ্ধার করা হয়। এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোট ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধীকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সেখানে তিনি দুটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন— প্রথমত, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আশ্বস্ত করা যে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেবে। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের মনে নির্বাচন নিয়ে আস্থা তৈরি করা, যাতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরঞ্জাম আনা-নেওয়ার জন্য সামরিক হেলিকপ্টার ও জলযান প্রস্তুত থাকবে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে আগে থেকেই হেলিকপ্টার মোতায়েন রাখা হবে। সেনাপ্রধানের নির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও ভুল তথ্য প্রচার এবারের নির্বাচনে বড় হুমকি উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, অপপ্রচারের মাধ্যমে প্রার্থী বা দলকে খাটো করা, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া কিংবা নির্বাচন-সংশ্লিষ্টদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা হতে পারে। এমনকি ছোট কোনো বিষয়কে বড় করে দেখিয়ে মানুষের মনে ভয় তৈরির চেষ্টা করা হতে পারে। এ ধরনের অপপ্রচার ঠেকাতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছে সেনাবাহিনী।
বড় দলগুলোর একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পেশিশক্তির ব্যবহার এবং নকল ব্যালট পেপার ছাপানোর মতো পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সেনাবাহিনীর কোনো আহ্বান আছে কি না এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সংশয়ের ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ব্যর্থতা দেখছেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সেনা সদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক বলেন, মানুষের মনের দ্বিধা দূর করতেই সেনাবাহিনী প্রধান সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আশ্বস্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা। রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিরই অংশ। যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি প্রশাসনিক আওতাভুক্ত। তবে অসামরিক প্রশাসন প্রয়োজন মনে করলে সেনাবাহিনী সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা দেবে। মনে রাখতে হবে, মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের মূল দায়িত্বে থাকেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটছে—এমনকি কার্যালয়ে হামলার মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সেনাবাহিনী কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী মিলেমিশে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য। আইন অনুযায়ী যা যা করা প্রয়োজন, সেনাবাহিনী তা করতে সব সময় প্রস্তুত।
নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব কোনো ঝুঁকি বিশ্লেষণ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখেই সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

Comments
Comments