[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থায় অর্থনীতিজুড়ে সংকটের শঙ্কা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে স্থবির হয়ে পড়ে বন্দরের কার্যক্রম | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু বন্দর চত্বরে সীমাবদ্ধ নেই। দ্রুতই এটি পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতির নানা খাতে ব্যাঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

কাজ বন্ধ থাকায় বন্দরে কনটেইনারের জট বাড়ছে, আমদানি পণ্য ছাড়ের গতি কমেছে, রপ্তানি চালান নির্ধারিত সময়সূচি পূরণ করতে পারছে না। পাশাপাশি প্রতিদিনই বাড়ছে সংরক্ষণ খরচ, জাহাজের বিলম্বজনিত জরিমানা ও ট্রাকের জরিমানা। এদিকে সামনেই রমজান মাস। এ সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সরকারের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের ডাকে শনিবার ও রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দুই দিনের কর্মবিরতি পালন করা হয়। শ্রমিক নেতারা একই সময়ে নতুন করে কর্মবিরতির ঘোষণা দেন এবং দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।

জানা গেছে, প্রতিদিন যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর সাধারণত ৮০০০ থেকে ৯০০০ একক কনটেইনার সামলানোর কাজ করে, সেখানে চলমান অচলাবস্থায় অন্তত ৫০০০ একক কনটেইনার সামলানোর কাজ এবং প্রায় ৩০০০ একক কনটেইনার পণ্য ছাড় কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর প্রভাবে বন্দরের ভেতরে এবং আশপাশের পণ্য সংরক্ষণ এলাকায় তীব্র জট তৈরি হয়েছে। ৫০০০-এর বেশি আমদানি ও রপ্তানিমুখী পণ্যবোঝাই যানবাহন আটকে রয়েছে।

এই বিঘ্নে সরবরাহব্যবস্থার শৃঙ্খলে আর্থিক চাপ দ্রুত বাড়ছে। আমদানিকারকদের প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ২৪ থেকে ১৯২ ডলার পর্যন্ত সংরক্ষণ খরচ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, জাহাজের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পিছিয়ে যাওয়ায় নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিটি জাহাজে ১৫০০০ থেকে ২০০০০ ডলার পর্যন্ত দেরিজনিত ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে, বন্দরের ভেতরে আটকে থাকা প্রতিটি ট্রাকের জন্য পরিবহন পরিচালকদের প্রতিদিন ৫০০০ থেকে ১০০০০ টাকা জরিমানা দিতে হচ্ছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এই অতিরিক্ত খরচ সরবরাহব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শেষ পর্যন্ত এটি নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানিকারক, সেখান থেকে পাইকার এবং শেষে ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। ফলে রমজানের আগমুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

আমদানিকারক ও শুল্ক প্রতিনিধি আকরামুল হক মামুন বলেন, ‘অতিরিক্ত খরচ কখনোই উধাও হয় না। শেষ পর্যন্ত তা পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ হয়ে ভোক্তার ওপরই পড়ে।’ তিনি বাজারজুড়ে এর ধারাবাহিক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করে সরকার সম্প্রতি বন্দরের জট কিছুটা কমাতে পেরেছিল। কিন্তু আবারও বন্দরের কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে রপ্তানিমুখী চালানগুলো জাহাজের সময়সূচি মিস করবে, কারণ জাহাজ অপেক্ষা করবে না। সময়মতো পণ্য পাঠানো না গেলে অর্ডার বাতিল হতে পারে। তখন ক্রেতারা মূল্যছাড় দাবি করতে পারেন, অথবা রপ্তানিকারককে কয়েক গুণ বেশি খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব পরিস্থিতির যেকোনো একটিতে পড়লে কোনো রপ্তানিকারকের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি, যাতে যত দ্রুত সম্ভব সমস্যার সমাধান হয়।’

চট্টগ্রাম তাজা ফল আমদানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম বলেন, ‘বন্দর থেকে একটি কনটেইনার ছাড় করতে এক দিন দেরি হলেই আমদানিকারকের অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। শেষ পর্যন্ত এই খরচ পণ্যের দামে যোগ হয় এবং ভোক্তাদেরই তা বহন করতে হয়।’

এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোগুলোতেও। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিকদার জানান, ধর্মঘটের পর রপ্তানি পণ্য ছাড় শুক্রবারের ২ হাজার ৯৪১ টিইইউ থেকে শনিবারে নেমে এসেছে ১ হাজার ৬১০ টিইইউতে। একই সময়ে আমদানি পণ্য ছাড় ১ হাজার ৪১০ টিইইউ থেকে কমে মাত্র ৬০০ টিইইউতে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে কার্যক্রম ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে।

রোববার সকালে বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালগুলো অস্বাভাবিকভাবে নীরব। গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ পণ্য সামলানোর বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই দশকে এমন চিত্র দেখা যায়নি।

পরিবহন মালিকরা বলছেন, জরিমানার তাৎক্ষণিক চাপ তাদের ওপরই পড়ছে, যদিও শেষ পর্যন্ত এই খরচ আমদানিকারকদের কাছ থেকে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইম মুভার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত খরচ আমদানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করা হয়, আর পরে তা ভোক্তাদের ঘাড়েই গিয়ে পড়ে।’

রমজান শুরু হতে আর ২০ দিনেরও কম সময় বাকি থাকায় ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে সামান্য সময়ের বিঘ্নও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এখানে কয়েক ঘণ্টার বিঘ্নও পুরো অর্থনীতিতে ঢেউয়ের মতো প্রভাব ফেলতে পারে।’ সংকট সমাধানে আলোচনার আহ্বান জানান তিনি।

এনসিটি চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে শনিবার বন্দর কর্তৃপক্ষ চার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালে বদলি করে। তাঁদের গতকাল সকালের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে বদলি হওয়া কর্মকর্তারা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে কর্মবিরতিতে অংশ নেন।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করেছে। কর্তৃপক্ষের প্রধান জনবল কর্মকর্তার জারি করা দুটি পৃথক অফিস আদেশে এসব বদলি করা হয়। কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, বদলি হওয়া অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী বন্দরের পরিচালনাভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির প্রভাব কমিয়ে দেখিয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আংশিক বিঘ্ন সত্ত্বেও বন্দরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি জানান, আগের দিন ১,০০০ টিইইউ পণ্য ছাড় হয়েছে এবং ১,৭০০ টিইইউ পণ্য ছাড়ের সূচি রয়েছে।

তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল মোতায়েন করা হয়েছে এবং বন্দর অচল—এমন দাবি তিনি প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেন।

বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের যোগদান না করার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এনসিটি চুক্তি সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়ন করবে।’ তবে কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে কনসেশন চুক্তি কবে স্বাক্ষর হবে—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। তিনি জানান, বিষয়টি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে।

শ্রমিক নেতারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আন্দোলনের সময় কোনো কার্যক্রমই হয়নি।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, এনসিটি বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল এবং এখানে বিদেশি ব্যবস্থাপনার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং প্রশ্ন তোলেন—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হলো না কেন।

তিনি বলেন, ‘মাত্র ১১ দিনের মধ্যে দেশ একটি নির্বাচিত সরকার পেতে যাচ্ছে। তাহলে কেন এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত সেই সরকারের জন্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে না?’

আরেক শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, দুই দিন কর্মবিরতির পরও কর্তৃপক্ষ কোনো সংলাপে না গিয়ে ‘অযৌক্তিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নিয়েছে।

তিনি সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নতুন কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাদের কথা না শুনলে মঙ্গলবার থেকে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দিতে পারি।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন