সহিংসতার আশঙ্কায় ১৩ সংসদীয় আসনে বাড়তি সতর্কতা
| ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা বাড়ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশের বিশেষ শাখা আসনভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় পাল্টাপাল্টি হামলা, ভোটকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও নাশকতার আশঙ্কায় কিছু আসনকে ‘গোলযোগপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের তালিকায় পাবনা, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালীসহ ১০ জেলার ১৩টি আসন অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এসব এলাকায় থাকবে বাড়তি নজরদারি এবং নির্বিঘ্ন পরিবেশ বজায় রাখতে মাঠ পর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৪৫টি আসনকে মধ্যম ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে।
তপশিল ঘোষণার পর থেকে দেশে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। এখন পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনা ২০০ ছাড়িয়েছে এবং পাঁচজন নিহত হয়েছেন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ৫০টি আসনে সংঘর্ষ ঘটেছে, বাকি এলাকায় পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ জেলার ১৩টি আসনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব আসনে থাকবে বাড়তি নজরদারি। তালিকাভুক্ত আসনগুলো হলো পাবনা-১ ও ৩, খুলনা-৫, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-৫, টাঙ্গাইল-৪, শেরপুর-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা–৭, কুমিল্লা-৪, নোয়াখালী-৬ ও চট্টগ্রাম-১৫। পুলিশ জানিয়েছে, এ আসনের কয়েকটিতে ইতিমধ্যেই একাধিক দফায় নির্বাচনী সংঘাত ঘটেছে।
পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুর ও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হাসান মামুনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সর্বশেষ শনিবার রাত ১১টার দিকে সংঘর্ষ হয়। গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর চত্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এই ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের ১৫ জন আহত হন। এর আগে ২৬ জানুয়ারি দশমিনার পাগলা বাজারে তাদের মধ্যে সংঘর্ষে সাতজন আহত হয় এবং উভয় পক্ষের নির্বাচনী অফিসও ভাঙচুর করা হয়।
খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আলি আসগার লবি লড়ছেন। এখানে জামায়াতের প্রার্থী দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘাত না হলেও পুলিশ এটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বরিশাল-৫ (সদর-সিটি করপোরেশন) আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার লড়ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সমর্থিত ডা. মনীষা চক্রবর্তী। এখানে বড় ধরনের সংঘাত হয়নি, তবে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের আয়োজনে সংলাপ অনুষ্ঠানে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে।
কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। তাঁর প্রার্থিতা ফিরে পেতে করা লিভ টু আপিল খারিজ করেছেন আপিল বিভাগ। এখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ লড়ছেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত মো. জসীম উদ্দিন (ট্রাক), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী ইরফানুল হক সরকার (আপেল), খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (দেওয়াল ঘড়ি) এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. আব্দুল করিম (হাতপাখা)।
ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লড়ছেন শাপলা কলি প্রতীকে। জাতীয় পার্টির মো. জুবের আলম খান লাঙ্গল নিয়ে মাঠে রয়েছেন। ঢাকা-৮ আসনে রাজধানীর রমনা, শাহবাগ, মতিঝিল, কাকরাইল ও মগবাজারের অংশ অন্তর্ভুক্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয় থাকায় এটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র।
ঢাকা-১৫ আসনটিও পুলিশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে। এখানে প্রচারণায় জমে উঠেছে। বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং জামায়াতের হয়ে লড়ছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে প্রতিপক্ষ দল কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা করছে। তারা প্রশাসনকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে। তাই এ আসনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হবে প্রশাসনকে।’
বরিশাল-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘বিএনপির আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তারা পুরোনো বন্দোবস্ত নতুন করে চালু করতে চায়। ২০০১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তারা সন্ত্রাস করেছে। সবাই জানেন, আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচনের পরিস্থিতি কেমন ছিল। কয়েক দিন আগে শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে একটি টেলিভিশন সংলাপ অনুষ্ঠানে বিএনপির কর্মীরা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকে বিএনপি নিয়ে আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়েছে।’
মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় মজিবর রহমান সরোয়ারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বরিশাল-৫ আসনে বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রধান আনোয়ারুল হক তারিন বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনের দিন চরমোনাই ইউনিয়নের একটি কেন্দ্রে পীরের লোকজন হামলা করে মজিবর রহমান সরোয়ারকে রক্তাক্ত জখম করেছে। আমরা চরমোনাই ইউনিয়নের প্রতিটি কেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি।’
বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘দেশের ৩০০টি আসনই ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। তারা কীভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে পারবে– আমার বোধগম্য নয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। ভোটের দিন কেন্দ্রে সন্ত্রাস হলে তারা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে মনে হয় না।’
খুলনা-৫ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘নির্বাচনী পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এলাকার হিন্দু ও নারীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। ডুমুরিয়ার মঠবাড়িয়ায় আমার উঠান বৈঠক হতে দেয়নি। ফুলতলায় প্রচারণায় বাধা ও নারীদের হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেলাম, তিন দিন আগে এলাকায় আওয়ামী লীগের পলাতক সন্ত্রাসীরা গোপন বৈঠক করেছে। অবৈধ অস্ত্র মজুত করা হচ্ছে। জিততে না পারলে কেন্দ্র দখলের হুমকি দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনের পরিবেশ ব্যাহত হবে।’
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের আশঙ্কায় মধ্যম ঝুঁকিতে থাকা আসনের তালিকায় রয়েছে– পঞ্চগড়-১, ঠাকুরগাঁও-১, ঠাকুরগাঁও-৩, লালমনিরহাট-১, রংপুর-৩, রংপুর-৪, গাইবান্ধা-৫, বগুড়া-২, বগুড়া-৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, রাজশাহী-১, রাজশাহী-২, নাটোর-১, সিরাজগঞ্জ-৪, কুষ্টিয়া-১, কুষ্টিয়া-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, ঝিনাইদহ-৩, ঝিনাইদহ-৪, যশোর-২, খুলনা-৪, সাতক্ষীরা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-২, ভোলা-১, বরিশাল-৩, পিরোজপুর-২, টাঙ্গাইল-৮, ময়মনসিংহ-১০, ময়মনসিংহ-১১, নেত্রকোনা-৩, কিশোরগঞ্জ-৫, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৭, ঢাকা-১০, নারায়ণগঞ্জ-৩, ফরিদপুর-৪, সুনামগঞ্জ-২, মৌলভীবাজার-৩, কুমিল্লা-১১, চাঁদপুর-৪, নোয়াখালী-২, চট্টগ্রাম-১৪ ও চট্টগ্রাম-১৬।
পুলিশ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত এসব আসনের সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও ঘাটতি ধরা পড়লে তা মাঠ প্রশাসনকে জানানো হবে। নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসনকর্মীদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক হচ্ছে। মাঠ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে পুলিশ ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিমুক্ত আসনের তালিকা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করবে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় নতুন আসন যুক্ত হতে পারে, আবার অনেক আসনে সহিংসতার ঝুঁকির মাত্রা কমতেও পারে।
জানুয়ারি মাসে বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) ৬৪টি নির্বাচনী সহিংসতার তথ্য দিয়েছে। এসব ঘটনায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে, আর ৫০৯ জন আহত হয়েছেন। তুলনায় ডিসেম্বর মাসে সারাদেশে সাতটি সহিংসতায় একজন মারা যান, ২৭ জন আহত হয়েছিলেন।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৫১টি আসনে নির্বাচনী সংঘর্ষ হয়েছে। এসব আসন হলো– পঞ্চগড়-১, লালমনিরহাট-১, চুয়াডাঙ্গা-১, বরগুনা-২, পটুয়াখালী-৩, ভোলা-১, বরিশাল-৩, টাঙ্গাইল-৮, শেরপুর-৩, নেত্রকোনা-৩, মানিকগঞ্জ-১, মুন্সীগঞ্জ-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, কুমিল্লা-১১, যশোর-৫, কুমিল্লা-৯, বাগেরহাট-১, খুলনা-৩, শরীয়তপুর-১, সিরাজগঞ্জ-১, ঢাকা-১২, ভোলা-৩, চট্টগ্রাম-২, ফেনী-৩, ফেনী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, ময়মনসিংহ-১, বগুড়া-৫, কিশোরগঞ্জ-৪, চট্টগ্রাম-১১, বরিশাল-১, মাদারীপুর-৩, ভোলা-২, ময়মনসিংহ-৯, লক্ষ্মীপুর-২, টাঙ্গাইল-১, খুলনা-২, সিরাজগঞ্জ-২, জামালপুর-৪, শরীয়পুর-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঢাকা-৩, ঝালকাঠি-১, চট্টগ্রাম-১, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-২, ঢাকা-৪ ও ভোলা-৪।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, যেসব ভোটকেন্দ্রে সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ভিডিও ধারণ করা হবে। কোনো সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগেই অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ডিএমপির অর্থায়নে আরও ৬০০ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) বসানো হচ্ছে।
রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মোট আট লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনী এক লাখ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী পাঁচ হাজার, বিমানবাহিনী তিন হাজার ৭৩০, পুলিশ এক লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড তিন হাজার ৫৮৫, র্যাব সাত হাজার ৭০০ এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ১৩ হাজার ৩৯০ জন সদস্য দায়িত্বে থাকবেন।
Comments
Comments