[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য রপ্তানি বন্ধ, আটকা ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য

প্রকাশঃ
অ+ অ-
কর্মবিরতির কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) কার্যক্রম। বুধবার দুপুরে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

চট্টগ্রাম বন্দরে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার কনটেইনার পণ্য রপ্তানি হয়। তবে টানা কর্মবিরতির দ্বিতীয় দিন বুধবার বন্দর থেকে এক কনটেইনার পণ্যও বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। আন্দোলনকারীদের বাধার কারণে কোনো জাহাজ বন্দর জেটি ছেড়ে যেতে না পারায় পণ্য রপ্তানি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

টানা কর্মবিরতির ফলে বন্দর চত্বর, জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ এবং বেসরকারি ডিপোতে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার আটকে আছে। এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের আনুমানিক দাম ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর কাছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি চলছে। গত শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা টানা কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

লাগাতার কর্মবিরতির কারণে পণ্য রপ্তানি না হওয়ায় বন্দর চত্বর, জেটিতে থাকা ১০টি জাহাজ ও বেসরকারি ডিপোতে আটকে আছে প্রায় ১৩ হাজার একক রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার। এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের মূল্য আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলার বা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। অথচ টানা পাঁচ দিন ধরে বন্দরের কাজ ব্যাহত হলেও এই সমস্যা সমাধানে সরকারের কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হলে তৈরি পোশাকশিল্পই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ, দেশের আমদানি ও রপ্তানির বড় অংশই এই খাতের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পোশাক রপ্তানি করা না গেলে বিদেশি ক্রেতারা পণ্যের দাম কমানোর দাবি তুলবে, এমনকি তারা ক্রয়াদেশ বাতিলও করতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ বন্ধ থাকার খবর ইতিমধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে গেছে এবং তারা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী আরও বলেন, বন্দর বন্ধ থাকায় কাঁচামাল পেতে দেরি হবে। এতে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং পোশাক তৈরির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাবে না। কোনো কারণে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা না গেলে পোশাকশিল্পের মালিকদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) জাহাজ ‘এমএসসি পোলো–২’ গত ৩১ জানুয়ারি আমদানিকৃত কনটেইনার নিয়ে বন্দর জেটিতে ভেড়ে। জাহাজটির ৭৪৯ একক রপ্তানি কনটেইনার নিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে জেটি ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু আন্দোলনের কারণে জাহাজটি এখনো জেটিতে আটকে আছে।

এমএসসির একজন কর্মকর্তা জানান, এই কনটেইনারগুলো সিঙ্গাপুরে নামিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী বড় জাহাজে তোলার কথা ছিল। তিন দিনেও জাহাজটি ছাড়তে না পারায় পুরো সময়সূচি ওলটপালট হয়ে গেছে। এর ফলে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য বিদেশি ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

একই কোম্পানির আরেকটি জাহাজ ‘এমএসসি জেনা’ ১ হাজার ৩২৯ একক কনটেইনার নিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি থেকে সাগরে অপেক্ষা করছে। এসব কনটেইনারের বড় অংশই পোশাকশিল্পের কাঁচামাল। জেটিতে থাকা জাহাজগুলো বের হতে না পারায় নতুন জাহাজ ভেড়ানো যাচ্ছে না। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। 

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হলে তৈরি পোশাকশিল্পই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার কারণ আমদানি–রপ্তানির সিংহভাগই তৈরি পোশাকশিল্পের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি না হলে বিদেশি ক্রেতারা মূল্যছাড় চাইবে। এমনকি ক্রয়াদেশ বাতিলও করতে পারে।

— বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী

বুধবার পর্যন্ত আমদানিকৃত কনটেইনার নিয়ে ৯টি জাহাজ বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার আরও ৯টি জাহাজ বন্দর জলসীমায় আসার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, চলমান অচলাবস্থার সমাধান না হলে আগামী এক দিনের মধ্যে ১৮টি জাহাজ সাগরে এবং ১০টি জাহাজ জেটিতে আটকা পড়বে।

আন্দোলনকারীদের বাধার কারণে বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল—জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম মঙ্গলবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে এই সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, পতেঙ্গার ‘আরএসজিটি চিটাগং’ টার্মিনাল থেকে মঙ্গলবার একটি জাহাজ ছেড়ে গেলেও বুধবার নির্ধারিত অন্য একটি জাহাজ সেখানে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে ওই টার্মিনালটি এখন জাহাজশূন্য হয়ে পড়েছে।

বন্দর ও জাহাজে থাকা কনটেইনার যোগ করলে আটকে থাকা রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার।
কনটেইনার ডিপো সমিতির হিসাব অনুযায়ী, আন্দোলন শুরুর আগে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানির অপেক্ষায় ছিল প্রায় ৮ হাজার একক কনটেইনার। বুধবার বিকেলের মধ্যে সেই সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বন্দর ও জাহাজে থাকা কনটেইনারসহ বর্তমানে আটকে থাকা রপ্তানি কনটেইনারের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজারে।

কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন জানান, সারা দেশের রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো থেকে কাভার্ড ভ্যানে করে প্রতিদিন পণ্য ডিপোগুলোতে আসছে। বর্তমানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি কাভার্ড ভ্যান পণ্য নিয়ে ডিপোগুলোতে দাঁড়িয়ে আছে। এসব পণ্য কনটেইনারে ভরা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বন্দর সচল না থাকায় সেগুলো জাহাজে তুলে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যের স্তূপ দিন দিন বড় হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ লাখ ৩১ হাজার ২৭০ একক কনটেইনারে পণ্য রপ্তানি হয়েছে। সেই সময়ে এসব পণ্যের মোট দাম ছিল ৪ হাজার ২৩২ কোটি ডলার। এই হিসাবে প্রতিটি কনটেইনারে গড়ে প্রায় ৫১ হাজার ডলারের পণ্য থাকে। সেই অনুযায়ী, বর্তমানে আটকে থাকা ১৩ হাজার কনটেইনারে থাকা রপ্তানি পণ্যের দাম প্রায় ৬৬ কোটি ডলার বা ৮ হাজার কোটি টাকা।
 
এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতেই এই আন্দোলন। শ্রমিক–কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন করছেন। কিন্তু সমাধানের কোনো উদ্যোগ না থাকায় বা দাবি না মানায় কর্মসূচি চলবে।
লচট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন
একদিকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতি চলছে। এর ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো দফায় দফায় কর্মচারীদের বদলির আদেশ আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে বাধ্য করতেই আমাদের এই আন্দোলন। শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু দাবি মানা বা আলোচনার কোনো উদ্যোগ না থাকায় এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন