অজ্ঞাতপরিচয় লাশ হিসেবে দাফন, তদন্তে বেরিয়ে এল প্রেমিকার পরিকল্পনায় খুন
![]() |
| নিহত আল আদিয়াত | ছবি: পরিবারের সৌজন্যে |
তরুণ আল আদিয়াতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক হয় নারায়ণগঞ্জের এক কলেজপড়ুয়া তরুণীর। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালে আদিয়াত আরেক তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই তরুণী প্রেমিককে হত্যার পরিকল্পনা করেন। নিজের নতুন প্রেমিক সৌদিপ্রবাসী মো. আরাফাতকে দিয়ে আদিয়াতকে শ্বাসরোধে হত্যা করান তিনি।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় বসবাসকারী এক তরুণকে অপহরণের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, ডিবি। ডিবির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মোহাম্মদ শাহীন আজ বৃহস্পতিবার বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা আদিয়াত হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিহত আদিয়াতের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ঢাকায় এসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কোর্সে ভর্তি হন। কেরানীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় থেকে তিনি ফ্রিল্যান্সিং শিখছিলেন। আর ওই তরুণী নারায়ণগঞ্জের তুলারাম কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁর মামাবাড়ি ও আদিয়াতের বাড়ি একই এলাকায়। তাঁরা দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
ভুক্তভোগী আদিয়াতের বাবা মিজানুর রহমান বাদী হয়ে গত ১৩ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালতে অপহরণের মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেয় রাজধানীর কদমতলী থানা–পুলিশকে। পরে বাদীর আবেদনের পর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবির ওয়ারী বিভাগকে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আদিয়াতের একাধিক প্রেমের বিষয়টি জানতে পারেন ওই তরুণী। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা–কাটাকাটি হয়। একদিন আদিয়াত ওই তরুণীকে ডেকে এনে গালাগালি করেন। পরে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই তরুণী তাঁর নতুন প্রেমিক সৌদিপ্রবাসী মো. আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে আদিয়াতকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
ডিবি সূত্র জানায়, সৌদি আরব থেকে গত নভেম্বরের শুরুতে দেশে আসেন আরাফাত। ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে ওই তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই তরুণী আবার আদিয়াতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এক আত্মীয়ের বাসায় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে মিষ্টির একটি ব্যাগ এবং ব্যাগের ভেতরে প্লাস্টিকের দড়ি নিয়ে গত ৩ নভেম্বর আদিয়াতকে প্রথমে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এলাকায় নিয়ে যান তিনি। সেখানে আগে থেকেই ছয়–সাতজন সহযোগী নিয়ে অবস্থান করছিলেন আরাফাত। তবে ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বেশি থাকায় আরাফাত ফোন করে জানান, সেখানে কাজ করা যাবে না। এরপর আদিয়াতকে নিয়ে টঙ্গীর উলুখোলা এলাকায় যেতে বলেন।
একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আদিয়াতকে নিয়ে টঙ্গীর উলুখোলা এলাকায় যান ওই তরুণী। সেখানে গিয়ে আরাফাতের আগে থেকে ঠিক করা আরেকটি অটোরিকশায় ওঠেন তাঁরা। ওই অটোরিকশায় আরাফাতের সঙ্গে শ্যামল, নয়ন ও সাকিব নামে তিন তরুণ ছিলেন।
এরপর অটোরিকশাটি গাজীপুরের পুবাইল এলাকার দিকে রওনা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সন্ধ্যার পর তাঁরা টঙ্গী থেকে পুবাইলের দিকে যান। পুবাইলের হাড়ীবাড়ীরটেক এলাকার একটি নির্জন স্থানে পৌঁছে চলন্ত অটোরিকশায় মিষ্টির ব্যাগে রাখা প্লাস্টিকের দড়ি দিয়ে আদিয়াতের হাত–পা বেঁধে ফেলেন আরাফাত। পরে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহটি পুবাইল এলাকার মহাসড়কের একটি কালভার্টের পাশে ফেলে দেওয়া হয়। এ সময় আদিয়াতের মুঠোফোনটি নিয়ে যান হত্যাকারীরা।
পুলিশ সূত্র জানায়, ৪ নভেম্বর গাজীপুরের পুবাইল থানা–পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে আদিয়াতের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করে। পরিচয় না জানার কারণে তাঁকে গাজীপুরেই দাফন করা হয়।
মামলার বাদী আদিয়াতের বাবা মিজানুর রহমান বলেন, ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি। পাশাপাশি ছেলের মরদেহ গ্রামে নিয়ে দাফন করার ইচ্ছার কথাও জানান। তিনি বলেন, মরদেহ গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে স্থানীয় থানা–পুলিশ তাঁকে সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

Comments
Comments