বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সামনে রেখে জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির দিকে তাকিয়ে পাকিস্তান
| দুই দেশের নতুন সম্পর্ক | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধানের মধ্যে বৈঠকে ঢাকার কাছে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিক্রিসহ একটি সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে অস্ত্র বিক্রি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দুই দেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের এই বৈঠকের তথ্য জানিয়েছে।
গত বছরের মে মাসে চিরশত্রু ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে পাকিস্তান। পরমাণু শক্তিধর দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ওই যুদ্ধ ছিল প্রায় তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সংঘাত।
![]() |
| জেএফ-১৭ থান্ডার হলো চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে তৈরি করা একটি ‘মাল্টি-রোল’ যুদ্ধবিমান | ছবি : রয়টার্স |
জেএফ-১৭ থান্ডার হলো চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে তৈরি করা একটি ‘মাল্টি-রোল’ যুদ্ধবিমান। এর আগে ২০১৯ সালেও ভারতের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের সময় এই যুদ্ধবিমান নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করে বলে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়।
মঙ্গলবার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ইসলামাবাদে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সফরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশ গবেষণা (অ্যারোস্পেস) খাতে অগ্রগতিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি উভয় পক্ষের মধ্যে সরাসরি সহযোগিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় আরও জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধানকে তাদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উন্নত পর্যায়ের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত কোর্সের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে সহযোগিতার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
আইএসপিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান ‘সুপার মুশাক’ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান দ্রুত সরবরাহের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধকালীন সাফল্যের প্রশংসা করেন। তিনি তাদের আভিযানিক দক্ষতা থেকে শেখার আগ্রহও প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পুরোনো বিমানবহরের রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা এবং আকাশপথে নজরদারি বাড়াতে আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা সংযোজনের বিষয়ে সহযোগিতা চান তিনি।’
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘জেএফ–১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।’ এ ছাড়া প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনাও পরিদর্শন করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) একটি সূত্র আজ বুধবার জানায়, বিষয়টি এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এ অবস্থায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের মধ্যে হওয়া এই আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের আভাস দিচ্ছে।
পাকিস্তানের আইএসপিআর জানিয়েছে, ‘এই সফর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী ঐতিহাসিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এটি দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার অভিন্ন অঙ্গীকারের প্রতিফলন।’
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইসলামাবাদ ও ঢাকা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো সরাসরি বাণিজ্য চালু করেছে। ওই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। একই সময়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যেও বেশ কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলগুলো, যারা একসময় নিষিদ্ধ ছিল, সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় যেতে পারে।
জেএফ–১৭ যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। আজারবাইজানের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি চুক্তিতে এবং লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তিতেও এসব যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মঙ্গলবার পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, অস্ত্র খাতে সাফল্য দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে।
পাকিস্তানের সম্প্রচারমাধ্যম জিও নিউজকে খাজা আসিফ বলেন, ‘আমাদের যুদ্ধবিমান পরীক্ষিত। আমরা এত বেশি অর্ডার পাচ্ছি যে ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রয়োজন না–ও হতে পারে।’


Comments
Comments