অমর একুশে বইমেলায় শিশুপ্রহর, পাপেট শোতে মেতেছিল শিশুরা
![]() |
| অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে পাপেট শো। ৬ মার্চ ২০২৬ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
অমর একুশে বইমেলায় শুক্রবার ছিল তৃতীয় শিশুপ্রহর। মেলায় এসেছিল নানা বয়সী শিশু। কেউ এসেছে বাবা-মায়ের হাত ধরে, কেউবা স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে। বইয়ের স্টলে ঘুরে ঘুরে তারা খুঁজে বেরিয়েছে গল্প, ছড়া, রূপকথা কিংবা বিজ্ঞানের বই। অনেকেই প্রথমবারের মতো বইমেলায় এসে বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল সারি সারি বইয়ের দিকে।
তবে শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাপেট শো (পুতুলনাচ)। বেলা সাড়ে ১১টায় কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের মঞ্চে শুরু হয় এই প্রদর্শনী। ছোট ছোট রঙিন পুতুল ও পাখির মাধ্যমে বলা হয় নানা শিক্ষণীয় গল্প। এসব গল্পে সততা, বন্ধুত্ব এবং পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা শিশুদের সামনে তুলে ধরা হয়।
পাপেটকে গল্প বলতে দেখে উচ্ছ্বাস আর কৌতূহলে মুখর হয়ে ওঠে শিশুরা। গল্প বলার এই অভিনব পদ্ধতি শিশুদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। তারা মঞ্চের সামনে গোল হয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে পাপেট শো দেখে। কখনো হাসিতে ফেটে পড়ে, কখনো আবার গল্পের চরিত্রদের সঙ্গে কথাও বলতে শুরু করে তারা। শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
শিশুপ্রহরের আয়োজনের মূল লক্ষ্য শুধু বিনোদন নয়, বরং গল্পের মাধ্যমে কিছু শেখানো। আয়োজকেরা মনে করেন, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো শৈশব। তাই ছোটদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং তাদের কল্পনার জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করতে এই বিশেষ আয়োজন ভূমিকা রাখছে।
দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার পাপেট শো মঞ্চের সামনে শিশুরা গোল হয়ে বসে অপেক্ষা করছিল। তখন হঠাৎ মঞ্চে আসে পাপেট ‘আলো’। আলো তার বন্ধু ‘গগলু’কে খুঁজছিল। ছোট বন্ধুদের কাছে গগলুর খোঁজ করতেই শিশুরা সমস্বরে বলে ওঠে, ‘গগলু তুমি এসো... আমরা তোমার গল্প শুনব।’
এরপরই গগলু মঞ্চে হাজির হয়। তা দেখে আনন্দে মেতে ওঠে শিশুরা এবং হাততালি দিতে থাকে। গগলু তখন শিশুদের উদ্দেশে বলে, ‘আমাদের সঙ্গে বাঘ মামাও এসেছে। তোমরা অপেক্ষা করো।’
![]() |
| অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে পাপেট শো উপভোগ করছে শিশুরা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
গল্পের ছলে গগলু শিশুদের উপদেশ দিয়ে বলে, ‘তোমরা নিয়মিত বই পড়বে, গাছ লাগাবে এবং বাবা-মায়ের কথা মেনে চলবে। আর মোবাইলে গেমস খেলবে না।’
খিলগাঁও থেকে বইমেলায় পাপেট শো দেখতে এসেছিল শিশু তাইয়েমা হোসেন। তার মা তাহরিমা আক্তার তাকে মেলায় নিয়ে আসেন। পাপেট শো দেখে উচ্ছ্বসিত তাইয়েমা বলে, ‘পুতুলগুলো কথা বলছে, গল্প বলছে—এটা দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। বেশ মজা পাচ্ছি।’
তাহরিমা আক্তার জানান, তাঁর মেয়ে টেলিভিশনে পাপেট শো দেখে মেলায় আসার জন্য বায়না ধরেছিল। ছুটির দিন হওয়ায় মেয়েকে নিয়ে তিনি মেলায় ঘুরতে এসেছেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া তাইয়েমা ইতিমধ্যে রূপকথা ও ভূতের গল্পের বেশ কিছু বই কিনেছে।
আজ মেলার নবম দিন। প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় শিশুপ্রহর থাকছে। এই বিশেষ সময়ে বেলা ১১টায় মেলার গেট খোলা হয় এবং শিশুপ্রহর চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এরপর রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে দর্শনার্থীরা রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলায় প্রবেশের সুযোগ পান।
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক বলেন, ‘আমরা চাই শিশুরা মোবাইলে গেমস না খেলে বই পড়ুক এবং মাঠে খেলাধুলা করুক। শিশুরা আনন্দের মধ্য দিয়ে শিখুক—এটাই আমাদের পাপেট শোর মূল উদ্দেশ্য।’
আসাদুজ্জামান আশিক আরও জানান, এবার মেলায় প্রতিদিন পাপেট শো চলছে। আজ ‘বল্টু মামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গ’ এবং ‘বন ভ্রমণ’ প্রদর্শিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে গল্প পাঠ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক রশীদ হারুন।
![]() |
| অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে বায়োস্কোপ দেখছে শিশুরা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পাশেই বসানো হয়েছে একটি ছোট বায়োস্কোপ। সেখানে শিশুদের উপচে পড়া ভিড়। বায়োস্কোপে দেখানো হচ্ছে ‘কুঁজো বুড়ির গল্প’—রঙিন, শিক্ষণীয় ও হাসির এক কাহিনি। লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে ছোটরা বড় বড় চোখ করে সেই গল্প দেখছিল।
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা শিশু জারা বায়োস্কোপ দেখে উচ্ছ্বসিত। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া জারা বলে, ‘অনেক মজার গল্প। সেখানে শিয়াল আছে, বাঘ আছে, আর একটা দাদুও আছে।’
জারা তার মা জুলেখা আক্তারের সঙ্গে মেলায় এসেছে। মেলা থেকে সে বেশ কিছু বইও কিনেছে। তার থলেতে জমা হয়েছে বিড়াল ও ইঁদুরের গল্প, ঝন্টুর ছোট মামা, বাবুই ও জোনাকি এবং বিজ্ঞানের কল্পকাহিনী (সায়েন্স ফিকশন)।
এতগুলো বই কত দিনে পড়বে—এমন প্রশ্নে জারার মা জুলেখা আক্তার জানান, সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ তিন দিন লাগতে পারে। তিনি বলেন, ‘জারা অনেক বই পড়ে। অন্য বাচ্চারা মোবাইল দেখতে চায়, কিন্তু আমি পরিকল্পিতভাবে ওর বই পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছি। এ জন্য প্রতিবছর মেলায় এসে ওকে অনেকগুলো বই কিনে দিই। মোবাইলে গেমস খেলার চেয়ে বই পড়া অনেক ভালো।’
![]() |
| অমর একুশে বইমেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে বই দেখছে শিশুরা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
উত্তরার আকিজ ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৬ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশুকে নিয়ে বইমেলায় এসেছিলেন শিক্ষক ইম্মত আরা ও কাণিজ হোসেন।
সহকারী শিক্ষক ইম্মত আরা জানান, তাঁদের স্কুলে ৪৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের বেশির ভাগই অসহায় এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের নয়। এসব শিশুর অনেকেরই বাবা-মা তাদের খোঁজ রাখেন না। তাদের মধ্য থেকে ১৬ জনকে নিয়ে তিনি মেলায় এসেছেন। স্কুল থেকে শিশুদের বই কেনার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে তারা নিজেদের পছন্দমতো বই কিনবে।
শিক্ষক কাণিজ হোসেন কয়েকজন শিশুকে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুমার ঝুলি’, বোরহান মাহমুদের ‘গল্পে গল্পে জ্ঞান’ এবং নির্মলেন্দু গুণ ও আল মাহমুদের নির্বাচিত ছড়ার বই কিনে দেন। এ ছাড়া তিনি শিশুদের আরও বেশ কিছু বই উপহার দিয়েছেন।
উপহার পাওয়া শিশুদের একজন মিম। সে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে, ‘মেলায় আসতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে। আমি আবার এখানে আসতে চাই।’




Comments
Comments