ঢাকার খুনে পুলিশের ‘বিদেশ ফর্মুলা’
| প্রতীকী ছবি |
রাজধানী ঢাকায় কোনো ‘হাইপ্রোফাইল’ কেউ খুন হলে বা অন্য কোনো আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটে, প্রায়ই পুলিশের ভাষ্যে উঠে আসে বিদেশে থাকা সন্ত্রাসী বা ‘গডফাদারের’ নাম। দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের ওপর দায় চাপানোর কারণে অনেক ঘটনায় হত্যার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী ও তাদের উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত অজানা থেকে যায়।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পরিচিত কিছু অপরাধী বা পৃষ্ঠপোষকের ওপর দায় চাপালে জনমনে সহজে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়—এই হিসাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ এই পথ বেছে নেয়। এতে গভীর তদন্ত করে প্রকৃত পরিকল্পনাকারীর পরিচয় ও হত্যার কারণ জানার চাপ কমে। ফলে আলোচিত কিছু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ শেষ পর্যন্ত অন্ধকারেই থেকে যায়।
খুনের দায় বিদেশে থাকা এমন ব্যক্তিদের ওপর চাপানো হয়, যাঁরা সমাজে আগে থেকেই অপরাধী বা বিতর্কিত। এই ক্ষেত্রে তদন্ত মূলত ঘটে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বা সরাসরি হামলায় যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণের মাধ্যমে। অপরাধী যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, তারা হয় তদন্তের বাইরে।
গত এক বছরে রাজনীতিক, সন্ত্রাসী বা বিতর্কিত ব্যবসায়িক কার্যক্রমে যুক্ত অন্তত আটজনের হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের বক্তব্য ছিল বিদেশি উৎসকেন্দ্রিক। এসব ঘটনার পর জানানো হয়েছে, হত্যার নেপথ্যে রয়েছে দেশের বাইরে থাকা একাধিক সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি। নামগুলোও ছিল পরিচিত এবং আগে থেকেই নানা অপরাধের কারণে আলোচিত। কিন্তু বিদেশে থাকা কথিত অপরাধীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার নিশ্চিত প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তার করা হয় কেবল ঘটনাস্থলে থাকা শুটার, অস্ত্র সরবরাহকারী বা সহায়ক ‘লাইনম্যানদের’। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের কিছু মামলা এভাবে একসময় হিমাগারে চলে যায়।
ঢাকায় গত ছয় মাসের একাধিক হত্যা মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তদন্তে দায় চাপানো হয়েছে বিদেশে থাকা ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীদের ওপর।
সম্প্রতি এই ধরনের দাবি করা হয়েছে কারওয়ান বাজারে ৭ জানুয়ারি স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বিরের হত্যার পর। ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পরিকল্পনা হয় দেশের বাইরে থাকা এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, মুছাব্বিরকে হত্যা করার জন্য সাড়ে চার মাস আগে পরিকল্পনা করা হয় এবং বিদেশ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাঠানো হয়। হত্যার পেছনের মূল কারণ ছিল কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব। হত্যার সঙ্গে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুরের পল্লবীতে একটি দোকানে ঢুকে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়। তদন্তে যুক্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ বলেছে, মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও পলাতক আসামি মফিজুর রহমান ওরফে মামুন বিদেশে বসে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও দেনা-পাওনার বিরোধের কারণে ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে কিবরিয়াকে হত্যা করান।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২১ সালে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনি জামিনে বের হয়ে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামুন মালয়েশিয়ায় এবং তাঁর ভাই মশি ভারতে আছেন।
কিবরিয়া হত্যার কয়েক দিন আগে, ১০ নভেম্বর, পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন (৫৬)। পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি দীর্ঘদিন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। কয়েক বছর ধরে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। দেশের বাইরে থাকা ইমনের নির্দেশেই মামুনকে হত্যা করা হয়।
গত বছরের ২৫ মে, মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাটে বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যার পেছনে চাঁদাবাজি নিয়ে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্বকে কারণ হিসেবে বলা হয়। স্বীকারোক্তির সূত্রে ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, সাধন হত্যার নেপথ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী মেহেদী হাসান ওরফে কলিন্স।
এর কিছুদিন আগে, ২১ মার্চ, গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনে গুলি করে সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন (৩৩) নামে ইন্টারনেট ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, কেবল ও নেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদেশে থাকা বাড্ডা ও গুলশানের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও রবিন এই হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পুলিশের প্রায়ই এমন দাবি—হত্যার পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতা দেশের বাইরে আছেন—এর সমালোচনা করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) লাইফ সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘কোনো কোনো বড় অপরাধী দেশ-বিদেশে থাকে। তবে সব ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা কখনো কখনো উদ্দেশ্যমূলক হতে পারে। পরিচিত নাম সামনে আনলে সাধারণ মানুষ সহজেই তা বিশ্বাস করে নেয়। এমন ধারণা থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ এই কৌশল অনুসরণ করে। ফলে প্রকৃত নেপথ্য শক্তি, স্বার্থচক্র ও হত্যার উদ্দেশ্য অন্ধকারেই থেকে যায়। তদন্ত সীমাবদ্ধ থাকে কেবল অস্ত্রের ট্রিগার টানাদের শনাক্তকরণের মধ্যেই।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘হত্যাসহ যেকোনো ফৌজদারি মামলায় ঘটনার পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা অন্যতম আসামি। কিন্তু তাঁদের গ্রেপ্তার বা পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় না আসলে মামলার তদন্ত এগোয় না। ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা পরিবারও ন্যায়বিচার পায় না।’
তবে পুলিশ বলছে, তাদের দাবি উদ্দেশ্যমূলক নয়। হত্যার সঙ্গে যাদের যতটুকু জড়িত থাকা বা দায় তদন্তে পাওয়া যায়, তা-ই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে আগেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের পলাতক সদস্যদের সম্পৃক্ততা ছিল, এখনো আছে। অপরাধীরা এখন বিভিন্ন দেশে রয়েছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে এই সব হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’
Comments
Comments