ডিজিটালের যুগেও উড়িরচরে খবর পৌঁছায় ‘এলান’ মাইকে
![]() |
| খুঁটিতে বাঁধা রয়েছে মাইক। এই মাইকে প্রতিদিন দেওয়া হয় নানা ধরনের ঘোষণা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়িরচরের জনতা বাজারে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বাজারের দুই প্রান্তে দুটি খুঁটিতে মাইক টাঙানো আছে। কিছুক্ষণ পরপর এই মাইকগুলো বেজে ওঠে। এলাকাবাসী এখানে পণ্য ও যাত্রীবাহী ট্রলার কখন আসবে, বাজারে হঠাৎ কী পণ্য বিক্রি হচ্ছে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের খবরসহ নানা তথ্য মাইকের মাধ্যমে জানতে পারে। সম্প্রতি এমন দৃশ্য দেখা গেছে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উড়িরচরের জনতা বাজারে।
যে দুটি মাইক থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়, স্থানীয়রা সেগুলোকে ‘এলান’ মাইক নামে চেনে। দেশে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান যত সহজ হয়ে এসেছে, তবুও উড়িরচরের মানুষদের কাছে খবর পেতে এলান মাইকই প্রধান ভরসা।
উড়িরচরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরবালুয়া গ্রামের। উড়িরচর ও চরবালুয়া এলাকায় সাতটি বাজার আছে, এর মধ্যে চারটিতেই এলান মাইক বসানো আছে। এসব বাজার হলো— জনতা বাজার, বাতানি বাজার, বাংলা বাজার ও কলোনি বাজার।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জনতা বাজারের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে খুঁটিতে মাইক বাঁধা রয়েছে। বাসিন্দারা টাকার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় ঘোষণা পাঠাচ্ছেন। মাইকে ঘোষণা দেওয়ার দায়িত্ব একজন ব্যক্তি পালন করছেন। যে বার্তাটি দিতে হবে, প্রথমে তাঁকে বোঝানো হয়। এরপর তিনি মাইকে তা পাঠ করেন এবং বাঁশটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশে বার্তাটি ছড়িয়ে দেন।
বাজারের পূর্ব পাশে যাঁকে ঘোষণা দিতে দেখা যায়, তাঁর নাম মো. রুবেল। তিনি জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে এলাকায় মাইকিং করছেন তাঁর বাবা মো. শহিদুল্লাহ। বাবার অনুপস্থিতিতে তিনিই ঘোষণা পাঠান। আগে প্রতিটি ঘোষণার জন্য মানুষের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ টাকা নেওয়া হতো, এখন তা ৩০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে হয়। তাঁদের মাইক থেকে পাঠানো ঘোষণাগুলো তিন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে পৌঁছায়।
রুবেল বলেন, ‘আমাদের এখানে ডিজিটাল প্রচারণার ওপর মানুষের ভরসা নেই। এলাকার খবর ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে পেলেও মানুষ মাইকে ঘোষণার অপেক্ষায় থাকেন। মাইকে ঘোষণা দিলে তারা বেশি বিশ্বাস করেন।’
জনতা বাজারের পশ্চিম পাশে যে মাইক রয়েছে, তা স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলাউদ্দিনের। তিনি বলেন, ১০ বছর আগে তাঁর মাইকটি কেনা হয়েছে এবং প্রতিদিন ৫ থেকে ১০টি ঘোষণা পাঠ করেন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ঘাট থেকে উড়িরচরে যেতে কাঠের ট্রলার ব্যবহার করতে হয়। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে প্রতিদিন দুটি ট্রলার চলাচল করে। এর একটির মাঝি মো. বাবুল জানান, জোয়ারের সময়সূচি অনুযায়ী তারা ট্রলার চালান। তাই প্রতিদিন ট্রলার ছাড়ার ও পৌঁছানোর সময় উড়িরচরের এলান মাইকগুলোতে জানানো হয়। ট্রলার সংক্রান্ত ঘোষণা পাঠের জন্য মাসে বাজারের ‘মাইকম্যানদের’ ৬০০ টাকা করে দেওয়া হয়।
জনতা বাজারের কাপড়ের দোকানি কে এম সালাউদ্দিন বলেন, পুরো গ্রামের মানুষের কাছে তথ্যের প্রধান উৎস এলান মাইক। সরকারি বার্তা বা ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা—সবকিছুই মাইকের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বাজারে হঠাৎ কেউ মাছ-মাংস বিক্রি করতে আনে, সেটিও মাইকের মাধ্যমে প্রচার করা হয়।
উড়িরচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মানিক জানান, ‘আমাদের ইউনিয়নের আয়তন বড়, কিন্তু বসতি কম। তাই সবার কাছে খবর পৌঁছানো কঠিন ছিল। আশির দশকের শেষ দিকে এলাকায় মাইক আসে এবং তখন থেকে মাইকে খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এলান মাইকের খবরে মানুষের আস্থা জমে গেছে। ডিজিটাল যুগে ও মানুষ এখনো মাইকের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করেন। আমরা ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণসহ বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বাসিন্দাদের তথ্য জানাই।’

Comments
Comments