{getBlock} $results={3} $label={ছবি} $type={headermagazine}

কাঠগড়ার রেলিং ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন তৌহিদ আফ্রিদি

প্রকাশঃ
অ+ অ-

আদালতের হাজতখানা থেকে এজলাসে আনার সময় সিঁড়িতে হাঁপাতে থাকেন তৌহিদ আফ্রিদি। ২৫ আগস্ট | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

সকাল থেকেই খবর ছড়িয়ে পড়েছিল আজ সোমবার দুপুরে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর তৌহিদ আফ্রিদিকে আদালতে হাজির করা হবে। এ জন্য সকাল আটটা থেকেই ইউটিউবার, টিকটকাররা ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত চত্বরে ভিড় করতে থাকেন। দুপুর ১২টার পর মূল ধারার গণমাধ্যমকর্মীরাও আদালত চত্বরে আসতে থাকেন।

বেলা একটার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে তৌহিদ আফ্রিদিকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় নিয়ে আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বিকেল তিনটা ৫ মিনিটে তৌহিদ আফ্রিদিকে হাজতখানা থেকে বের করে আনে পুলিশ। তাঁর মাথায় ছিল পুলিশের হেলমেট, বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরানো। তৌহিদ আফ্রিদিকে একটি সরু গলি দিয়ে হাজতখানা থেকে বের করে আনে পুলিশ। এ সময় তাঁকে ঘিরে ধরেন অন্তত এক শ জন ইউটিউবার-টিকটকার।

এই ভিড় ঠেলে তৌহিদকে সামনের দিকে নিয়ে আসতে বেগ পেতে হচ্ছিল পুলিশ সদস্যদের। একপর্যায়ে তাঁরা ইউটিউবার ও সাংবাদিকদের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন দেখা যায়, তৌহিদ আফ্রিদি হাঁপাচ্ছেন। তাঁকে ঘিরে ধরেছিলেন পুলিশ সদস্যরা। এরপর তাঁকে নিচ থেকে সিঁড়ি দিয়ে হাঁটিয়ে দুইতলায় আনা হয়। সিঁড়ির মাঝপথে আবারও হাঁপাতে থাকেন তৌহিদ আফ্রিদি। তখন তাঁর দুই বাহু ধরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠাতে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। দুইতলায় আসার পর তিনি বেশ কিছুক্ষণ হাঁপাতে থাকেন। তখন পুলিশ সদস্যরা তাঁর হাতকড়া ও হেলমেট খুলে দেন। তখন তৌহিদ আফ্রিদি দুই পুলিশের দুই বাহু জড়িয়ে ধরে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে আসতে থাকেন।

এভাবে আদালতের ছয়তলায় এজলাস কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় তৌহিদ আফ্রিদিকে। কাঠগড়ায় তোলার পর প্রায় দুই মিনিট মাথা নিচু করেছিলেন তৌহিদ আফ্রিদি। পরে তিনি পানি পান করেন। এ সময় তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে তিনি কথা বলতে থাকেন। আদালত কক্ষে তখন দাঁড়াবার জায়গা নেই। আইনজীবী আর বিচারপ্রার্থীদের উপচে পড়া ভিড়।

দুই তলায় আসার পর তৌহিদ আফ্রিদি বেশ কিছুক্ষণ হাঁপাতে থাকেন। তখন পুলিশ সদস্যরা তাঁর হাতকড়া ও হেলমেট খুলে দেন। ২৫ আগস্ট | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

সময় তখন ৩টা ১৫ মিনিট। বিচারক এজলাসে ছিলেন। তৌহিদ আফ্রিদি কাঠগড়ার লোহার রেলিং ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক খান মো. এরফান তৌহিদ আফ্রিদিকে সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার যুক্তি তুলে ধরেন।

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শামসুদ্দোহা সুমন আদালতকে বলেন, ‘মাননীয় আদালত, তৌহিদ আফ্রিদি আসাদুল হক হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামি। তাঁর পিতা মাই টিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথীও এ হত্যা মামলার একজন আসামি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গত বছরের জুলাই আগস্ট যখন আন্দোলন করছিলেন ছাত্র-জনতা, তখন তৌহিদ আফ্রিদি এই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেন। আন্দোলনের পক্ষে যাঁরা ভিডিও বানাচ্ছিলেন, যাঁরা বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছিলেন, তাঁদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন এই তৌহিদ আফ্রিদি।’

পিপি শামসুদ্দোহা বলেন, ‘মাননীয় আদালত, এই তৌহিদ আফ্রিদি গত বছরের জুলাই-আগস্টে যেসব সেলিব্রিটি আন্দোলন বন্ধের পক্ষে ছিলেন, তাঁদের নানাভাবে উৎসাহিত করতে থাকেন। তিনি মাই টিভির পরিচালক হয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে লাইভ প্রচার করেছিলেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য প্রভাবিত হয়ে নিরীহ সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপরে গুলি চালিয়েছিলেন। সেই গুলিতেই গত বছরের ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে নিহত হন আসাদুল হক।’

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তৌহিদ আফ্রিদিকে রিমান্ডে নেওয়ার সপক্ষে আরও যুক্তি তুলে ধরেন পিপি শামসুদ্দোহা। তিনি বলেন, তৌহিদ আফ্রিদি ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্যতম সহযোগী তৎকালীন ডিবির প্রধান হারুন অর রশীদের ঘনিষ্ঠ পরিচিত। তিনি মূলত হারুনের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।

রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য শেষ হলে তৌহিদ আফ্রিদির পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে তাঁর জামিন আবেদন করেন। তাঁরা আদালতের কাছে দাবি করেন, তৌহিদ আফ্রিদি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। তিনি একজন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর। কোনোভাবেই তিনি জুলাই আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের বিপক্ষে ছিলেন না। আর যাত্রাবাড়ীর এই খুনের ঘটনার সঙ্গেও তিনি জড়িত নন।

তৌহিদ আফ্রিদির আইনজীবীরা আদালতের কাছে আরও দাবি করেন, তৌহিদ আফ্রিদি যে এই হত্যা মামলায় জড়িত নন, এ মামলার বাদী আদালতে হলফনামা দিয়েই বলেছেন। মামলার এজাহারে তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল ভুলবশত। তাই এই হত্যা মামলায় তৌহিদ আফ্রিদিকে রিমান্ডে নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

তৌহিদ আফ্রিদির পক্ষে লিখিতভাবে আদালতের কাছে দাবি করা হয়েছে, সম্প্রতি তৌহিদ আফ্রিদির কিডনিতে অস্ত্রোপচার হয়। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।

বিচারকাজ শেষে আদালতের নিচতলায় তৌহিদ আফ্রিদিকে ঘিরে ধরেন ইউটিউবার ও টিকটকাররা। ২৫ আগস্ট | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

আদালতে তৌহিদ আফ্রিদি কোনো কথা বলেননি। তৌহিদ আফ্রিদির পক্ষে আইনজীবী ফারহানা আক্তার লিখিতভাবে আদালতের কাছে আরও দাবি করেন, তৌহিদ আফ্রিদি তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

কাঠগড়ায় তৌহিদ আফ্রিদিকে বিমর্ষ দেখা যায়। আইনজীবী ছাড়া আর কারও সঙ্গে তিনি কথা বলেননি।

প্রায় ৩০ মিনিট আদালত রাষ্ট্রপক্ষ এবং তৌহিদ আফ্রিদির আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। পরে আদালত তৌহিদ আফ্রিদিকে এই হত্যা মামলায় পাঁচ দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দেন। আদালতের আদেশের পর তাঁকে কাঠগড়া থেকে ছয়তলায় লিফটের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। লিফটে তিনি নিচে নামেন। তখন তাঁকে ঘিরে ধরেন ইউটিউবার ও সাংবাদিকেরা। পরে পুলিশ সতর্ক প্রহরায় তাঁকে আদালতের হাজতখানায় নিয়ে যায়।

বিকেল চারটার পর সিআইডি তৌহিদ আফ্রিদিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের হাজতখানা থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যায়। গতকাল রোববার বরিশাল মহানগরের বাংলাবাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়। পরে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। উল্লেখ্য, তৌহিদ আফ্রিদির বাবা নাসির উদ্দিন সাথী ১৭ আগস্ট গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

একটি মন্তব্য করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন