[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

ফ্যামিলি কার্ডের জন্য প্রয়োজন ১৩ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
ফ্যামিলি কার্ড | প্রতীকী ছবি

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) আরও ৪০ লাখ পরিবারের নারীপ্রধানকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

প্রয়োজনীয় এই টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে আধা সরকারি পত্র দিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির বিশাল অংকের টাকা কোন খাত থেকে আসবে, এখন সেই উপায় খুঁজছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কোনো খাত থেকে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে, নাকি বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হবে—তা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে সভা করার কথা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই অর্থের উৎস নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেই আসতে হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড একটি ভালো উদ্যোগ। অন্য যেকোনো খাত থেকে খরচ কমিয়ে এই কার্ডের জন্য টাকা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ফ্যামিলি কার্ডে যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি ঢুকে না পড়েন এবং কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেলিম রায়হান আরও বলেন, অতীতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এত বড় বাজেট সামলানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে দেওয়া হবে, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। উপকারভোগীদের একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা প্রয়োজন। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১০০টির বেশি কর্মসূচি রয়েছে, এসব খাতে সংস্কার আনা দরকার।

গত ৩১ মার্চ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে দেওয়া আধা সরকারি পত্রে সমাজকল্যাণমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সারা দেশে এই কর্মসূচির মূল বাস্তবায়ন শুরু হবে।

আগামী অর্থবছরে সারা দেশের ৪০ লাখ পরিবারের নারীপ্রধানকে এই কার্ডের আওতায় ভাতা দেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।

চিঠিতে আরও বলা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এরই অংশ হিসেবে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার এই যুগান্তকারী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছিল, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমানের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর ১০ মার্চ রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বর্তমানে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারী এই কার্ড পেয়েছেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে পরবর্তী অর্থবছরে এর জন্য প্রয়োজন হবে আরও ১৩ হাজার কোটি টাকা।

গত ২৫ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও মানবিক সহায়তার টাকা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকের বিবরণ থেকে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও মানবিক সহায়তা খাতে ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সভায় উল্লেখ করা হয়, এসব প্রকল্পের কাজের মধ্যে যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটি বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাজের সাথে অন্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কাজের মিল বা দ্বৈততা এড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতে এসব কার্যক্রমকে এক করে একটি বড় কর্মসূচি গ্রহণ করার ওপর বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সভায় জানানো হয়, আগামী অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর), কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে মোট ৭ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এই কর্মসূচির টাকা থেকে একটি অংশ ফ্যামিলি কার্ডে স্থানান্তর করা যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে হবে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এতে বলা হয়, একই ধরনের সহায়তা একাধিক মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়ার ফলে কাজে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড পুরোপুরি চালু হলে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা সম্ভব হবে, যা এই দ্বৈততা বা একই ব্যক্তিকে একাধিকবার সুবিধা দেওয়া কমাতে সাহায্য করবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এখনো অর্থনীতির নড়বড়ে অবস্থা কাটেনি। তাই ফ্যামিলি কার্ড পুরোপুরি চালুর ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, এখন যে ১৪০টির মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আছে, সেগুলোর সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডের মিল আছে—এমন কর্মসূচি বাদ দেওয়া উচিত। এতে খরচ কমানো যাবে। দ্বিতীয়ত, সবার জন্য একসঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা সম্ভব হবে না। তাই নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে প্রথমে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, কর আদায়ের বর্তমান গতিতে বাজেটে এই ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বড় বরাদ্দ রাখা কঠিন। তাই যেসব খাতে কর ফাঁকি দেওয়া হয়, তা চিহ্নিত করে সেখান থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন