[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বৈশাখ মানে তাঁদের কাছে কালবৈশাখীতে টিকে থাকার লড়াই

প্রকাশঃ
অ+ অ-
চরের মানুষের কাছে বৈশাখ মানে কালবৈশাখী ঝড়ে টিকে থাকার লড়াই। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের আইরমারীর চরে  | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে বৈশাখ উৎসবের আনন্দ নিয়ে আসে না। চরের বাসিন্দাদের কাছে এই মাস মানেই দমকা হাওয়া আর কালো মেঘের সংকেত। সেই সঙ্গে থাকে মুহূর্তে সবকিছু হারানোর আতঙ্ক। তাঁদের কাছে বৈশাখ মানে কালবৈশাখী ঝড়ে টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম।

জেলা শহর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে নৌকায় প্রায় দুই ঘণ্টার পথ আইরমারীরচর। ছোট এই চরে বাস করে প্রায় ১২০টি পরিবার। জীবন চালানোর তাগিদে কেউ মাছ ধরেন, কেউ তাঁতের কাজে পাবনা বা সিরাজগঞ্জে যান, আবার কেউ ঢাকা শহরে শ্রমিকের কাজ করেন।

চরটির বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম (৪৭) তাঁদেরই একজন। একসময় তাঁর বাবার শত বিঘা ফসলি জমি ছিল। আইরমারীরচর, রলাকাটা ও পূর্ব দইখাওয়ার চরে থাকা সেই জমি এখন নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। সম্প্রতি কালবৈশাখী ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ঘর মেরামত করার সময় তিনি বলেন, বৈশাখ মাস এলেই ভয় আঁকড়ে ধরে। এই বুঝি জোরে ঝড়-তুফান শুরু হলো। ঝড়ে ঘর হারাবে, ফসল নষ্ট হবে—এই দুশ্চিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘোরে।

ওই চরের ষাটোর্ধ্ব সরবেশ আলী বলেন, চরের মানুষের আবার বৈশাখ কিসের! কালবৈশাখী ঝড় ছাড়া আমাদের আর কোনো বৈশাখ নেই। তিনি জানান, আগে ব্রহ্মপুত্র নদ অনেক দূরে ছিল। গ্রামে সচ্ছলতা ছিল, বৈশাখে মেলা বসত, হাডুডু আর লাঠিখেলা হতো। এখন নদীভাঙনে সবকিছু বদলে গেছে। কাজের খোঁজে যুবকেরা শহরমুখী হয়েছেন, আর গ্রামে পড়ে আছেন শুধু নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।

চরের এই জীবন শহরের বৈশাখ উদযাপনের চেয়ে একদম আলাদা। শহরে যখন পান্তা-ইলিশ, নতুন পোশাক আর শোভাযাত্রায় উৎসব চলে, তখন চরাঞ্চলের মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে ঝড়ের আশঙ্কায়। শহিদুল ইসলামের স্ত্রী মহুরা বেগম বলেন, শহরের মানুষ নতুন পোশাক পরে আনন্দ করে, আর চরের মানুষ ভাবে আজ আবার তুফান আসবে না তো?

কুড়িগ্রামের ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা সাড়ে চারশর বেশি চরে বছরের এই সময়টি সবচেয়ে অনিশ্চয়তার। নতুন ফসল, কাঁচা ঘরবাড়ি আর গবাদিপশু—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে থাকে। চরের মানুষের বড় একটি সমস্যা হলো ঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়া। মাঝের আলগার চরের খামারি মাইদুল ইসলাম বলেন, দেশ প্রযুক্তিতে উন্নত হয়েছে, কিন্তু আমরা ঝড়ের খবর আগেভাগে পাই না। আগে জানতে পারলে গরু-ছাগল নিরাপদে সরানো যেত, ঘরবাড়িও হয়তো কিছুটা বাঁচানো সম্ভব হতো।

স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মনির হোসেনের মতে, শিশুরা বইয়ে পড়ে বৈশাখ মানে উৎসব। কিন্তু বাস্তবে তারা এখানে ঘর বাঁচানোর লড়াই দেখে বড় হয়।

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, প্রতিবছর কালবৈশাখী ঝড়ে জেলার বিভিন্ন চরে শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এর সঠিক হিসাব রাখার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এ বছর এক দিনের ঝড়ে নাগেশ্বরী উপজেলায় অন্তত ১০টি বসতবাড়ি ভেঙে গেছে।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও চরের জীবন থেমে থাকে না। ঝড়ের পরদিনই কেউ ভাঙা ঘরের খুঁটি সোজা করে দাঁড় করান, কেউ আবার নতুন করে বীজ বোনেন। সব হারিয়ে এভাবেই আবার শুরু হয় চরের মানুষের টিকে থাকার লড়াই।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন