হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে শঙ্কা ও স্বজনদের উদ্বেগ
![]() |
| হামে আক্রান্ত শিশু আদনান ভূঁইয়াকে গত সোমবার ঢাকা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন বাবা। গতকাল দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সায়মা আক্তারের ছয় মাস বয়সী যমজ মেয়ে খাদিজা ও ফাতেমা হামে আক্রান্ত। নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা সায়মা গত শুক্রবার ঢাকার তিনটি হাসপাতাল ঘুরে দুই শিশুকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। অবস্থার কিছুটা উন্নতি দেখা দিলে গত শনিবার ফাতেমাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। বাড়িতে নিয়ে গেলে ফাতেমা আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। এখন হাসপাতালের শয্যা কম থাকায় ফাতেমাকে আর শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা যাচ্ছে না।
ফাতেমার নানি সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘ওরা তো যমজ, একজন চিকিৎসা পাবে, আরেকজন এভাবে মরে যাবে, তা কি হয়!’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, খাদিজার মতো হামে আক্রান্ত ৫২ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ২২ শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। শয্যা না থাকায় নতুন রোগী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। মহাখালীতে অবস্থিত রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখানে শয্যা কম থাকায় নতুন রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না।
হামে আক্রান্ত যমজ শিশু খাদিজা ও ফাতেমার নানি সোনিয়া জানান, শিশুদের মা সায়মা নারায়ণগঞ্জ থেকে গত শুক্রবার দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে আসেন। সেদিন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মাতুয়াইল শিশু মাতৃসনদ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে শিশুদের জন্য অক্সিজেনসহ শয্যা পাননি। শেষ পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে গিয়ে তাদের ভর্তি করেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খাদিজা কিছুটা নিস্তেজ থাকায় সোনিয়া বলেন, ‘সে আগের মতো আর খেলছে না, হাত-পা ছুড়ছে না; আর ফাতেমা বাসায় অসুস্থ। তাকে এখানে ভর্তি করতে না পারায় মা সায়মা কখনো নারায়ণগঞ্জে, কখনো হাসপাতালে এসে খাদিজার পাশে থাকছেন।’
সরেজমিন দেখা যায়, শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা একটি ইউনিট খোলা হয়েছে। ভর্তি শিশুদের প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এই ইউনিটে চিকিৎসাধীন ৯ মাস বয়সী শিশু আয়মান হোসেনের অক্সিজেনের চাহিদা বেশি, তাই তাঁকে বিশেষভাবে অতিরিক্ত অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তবে শিশুটিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া প্রয়োজন, জানিয়েছেন দায়িত্বশীল চিকিৎসা কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ।
আপেল মাহমুদ জানান, আইসিইউতে শয্যা কম এবং সেখানে থাকা অন্যান্য রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় হামে আক্রান্ত শিশুদের আইসিইউতে নেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হামে আক্রান্ত রোগী আসছে। শয্যা না থাকার কারণে তাদের ভর্তি করা যাচ্ছে না।
শিশু হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি বছরে এই হাসপাতালে মোট ১২৪ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ শিশু মারা গেছে। বয়সভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৬ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৫টি, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী ৪৪টি, ৯ মাস থেকে ২ বছর বয়সী ২৯টি, ২ থেকে ৫ বছর বয়সী ১১টি এবং ৫ বছরের বেশি বয়সী ৫টি শিশু রয়েছে।
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউতে তিন দিন ধরে হামে আক্রান্ত ছয় মাস বয়সী মরিয়মের চিকিৎসা চলছে। বাইরে তার মা মোছা ইয়াসমিন ও নানি তাসলিমা বেগম রয়েছেন। মা ইয়াসমিন বলেন, ‘প্রথমে নিউমোনিয়া দেখা দিয়েছিল। সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর আবার হালকা জ্বর শুরু হয়। জ্বর বাড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা অক্সিজেন দেওয়ার পরামর্শ দেন। চারটি হাসপাতাল ঘুরে এখানে এসে অবশেষে অক্সিজেন পেয়েছি।’
নানি তাসলিমা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘হাসপাতালে ঈদ করছি। সব আনন্দ চলে গেছে। আল্লাহ বাচ্চাটিকে শুধু বাঁচান।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য কনসালট্যান্ট এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, হাসপাতালে হামের চিকিৎসার জন্য ১০টি শয্যা রয়েছে। তবে হামে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখন ৭২। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম নিয়ে আরও ৪২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউতে শয্যার সংখ্যা পাঁচটি। বর্তমানে দুটি শয্যা বাড়িয়ে মোট সাতটি শয্যায় চিকিৎসা চলেছে। এ সাতটি শয্যের ছয়টিতে হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি, আর একটি শয্যায় ধনুষ্টঙ্কারের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া এইচডিইউ (উচ্চ নির্ভরতা ইউনিট) ওয়ার্ডের পাঁচটি শযার প্রতিটিতেই হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছেন।
তবে এই হাসপাতালের আইসিইউ মূলত বড়দের চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এখানে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ভেন্টিলেটর সাপোর্টের ব্যবস্থা নেই। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রীবাস পাল বলেন, ‘আমাদের আইসিইউতে শিশুদের জন্য ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা নেই। এগুলো বড়দের জন্য। আমরা সর্বোচ্চ মাত্রায় অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করি।’
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তাদের আলাদা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অন্য রোগীদের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালের প্রায় সব ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হয়েছে।
এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমাদের একই সঙ্গে সব রোগী জগাখিচুড়ি করে রাখতে হচ্ছে। পক্সের রোগীর সঙ্গে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। দেখা যায়, হামের রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি যায়, কিন্তু দুই দিন পর আবার পক্স নিয়ে আসে। আবার পক্সের রোগী বাড়ি গেলে, কিছুদিন পর হাম নিয়ে ফিরে আসে।’
সাত মাসের ছেলে আয়ানকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে ছিলেন মো. আল আমিন। তিনি কুমিল্লা থেকে এসেছেন। আল আমিন বলেন, ‘প্রথমে হাম বুঝতে পারিনি। ডাক্তার দেখেছেন। স্যালাইন আর ইনজেকশন দিয়েছিল। তা–ও কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরশু লাল দাগ দেখিয়ে ডাক্তার হাম বলে ঢাকায় পাঠায়।’
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ বছরের প্রথম তিন মাসে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে হামে আক্রান্ত ৬৪৪ রোগী। এই রোগীদের বেশির ভাগই মার্চ মাসে এসেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুসহ এ বছর ২৩ শিশু মারা গেছে। মৃত শিশুদের সবারই হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, হৃদ্রোগ ও কিডনির সমস্যার মতো জটিলতা ছিল।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত শিশুর বড় অংশ প্রথম হামের টিকা নেওয়ার সময়ই হাসপাতালে আসে নাই। রোগীদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বয়স ১০ মাসের কম। আক্রান্ত শিশুর মধ্যে এমন শিশুও আছে যারা টিকা নিয়েছে। অন্য বছরগুলোতে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা হাম নিয়ে আসত না, কিন্তু এ বছর এমন বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে।
হাসপাতালটিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় হাম পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এটি কেবল ভর্তি রোগীদের জন্য। বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই।
এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘যাকে টিকা দেওয়া হয়নি, ৯ মাস হওয়ার পর অবশ্যই তাকে টিকা দিতে হবে। পাঁচ বছরের নিচের যেকোনো বয়সের শিশু হাম হতে পারে। সর্দি-কাশির কয়েক দিনের মাথায় যদি ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তাহলে শিশুটিকে অন্য বাচ্চাদের থেকে আলাদা করতে হবে এবং কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে। অন্য বাচ্চাদের থেকে আলাদা রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি খুবই ছোঁয়াচে।’

Comments
Comments