[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রাজপথে ফিরছে উত্তাপ, সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের শঙ্কা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
জামায়াত ও এনসিপির লোগো | কোলাজ

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো রাজপথে নামছে বিরোধী জোট। রাজধানীতে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে শনিবার বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্য দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে থাকা ১১ দলের জোট। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে ঘোষিত এই কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন জোটের নেতারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংসদকেন্দ্রিক রাজনীতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াতে রাজপথে নামছে বিরোধীরা। দেশের রাজনীতিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এর ফলে রাজপথ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডক্টর আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ, যেখানে সংসদের বাইরে চাপ সৃষ্টি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হয়।

১১ দলীয় জোটের নেতারা জানিয়েছেন, শুরুতেই তাঁরা কঠোর কোনো কর্মসূচিতে যাচ্ছেন না। প্রথমে বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে। এতে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া গেলে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে তাঁরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবেন। তবে তার আগে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য। এরপর সরকারের মনোভাব বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘সরকার যদি ভুল পথ থেকে ফিরে না আসে, অর্থাৎ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা হয়, তবে আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বড় ধরনের কর্মসূচিতে যেতে হলে তা-ই করা হবে।’

বিরোধী জোটের এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় নাগরিক পার্টির এক নেতা বলেন, যখন সরকারের কোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, তখন সরকারবিরোধী সব পক্ষই ধীরে ধীরে এক হয়ে যায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও এমনটি দেখা গেছে। এখন তাঁদের জোটে যাঁরা নেই, তাঁরাও পর্যায়ক্রমে সরকারের বিরোধী যেকোনো কর্মসূচিতে সমর্থন জানাবেন বলে তাঁরা আশা করছেন।

নির্বাচনের আগে-পরে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে ‘সহযোগিতার মনোভাব’ দেখা গিয়েছিল, তা দিন দিন কমে আসছে। বরং বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই বিরোধের মূলে রয়েছে সংবিধান সংস্কার এবং সংসদের কাঠামো নিয়ে বিতর্ক।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে গত বৃহস্পতিবার সংসদে উত্থাপন করে বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধনী আকারে বিল পাসের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে কমিটি। অন্যদিকে গণভোট, মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ ১৬টি অধ্যাদেশ নতুন করে বিল আকারে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে বিল পাস না হলে এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাবে।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় স্থাপনের প্রস্তাবে ক্ষমতাসীন বিএনপির আপত্তি ছিল না।

বিরোধী দলের দাবি, গণভোট ও সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে সরকার সংস্কারের উল্টো পথে হাঁটছে। তাদের অভিযোগ, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে জনগণের রায়ের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদেই বিরোধী জোট আন্দোলনের পথে নামল।

জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘জনগণের রায় স্পষ্টভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলেও সরকারি দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি গণতন্ত্রের চরম অবমাননা। সংসদেও আমরা দেখছি, যুক্তির বদলে গায়ের জোরে আইনের ভুল ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা রাজপথের আন্দোলনে যাচ্ছি।’

আসিফ আরও বলেন, ‘সরকার যদি জনগণের রায় মেনে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তবে আমরা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তা না করলে পরবর্তী কর্মসূচি কেমন হবে, তা ১১ দলীয় জোট এবং সংস্কারপন্থী সব শক্তির সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে।’

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকার যদি বিরোধীদের দাবি পুরোপুরি উপেক্ষা করে, তবে আন্দোলন আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এটি দেশব্যাপী হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচিতেও রূপ নিতে পারে।

জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি সে রকমই ইঙ্গিত দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম বর্তমানে পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে রয়েছেন। তিনি দেশে ফেরার পর আগামী ৭ এপ্রিল ১১ দলীয় জোটের নেতারা আবারও বৈঠকে বসবেন। সেই বৈঠকে আরও কঠোর কর্মসূচির সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে একাধিক নেতা জানিয়েছেন।

তবে আন্দোলনের মাধ্যমে বিরোধী জোট তাদের দাবি আদায় করতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, অনেক কিছুই নির্ভর করছে সরকারের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সরকার অনেক সময় বিরোধীদের কথা কানে তোলে না। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। এবার সরকার ও বিরোধী জোট কোন পথে হাঁটে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন