[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

টাকা দিয়ে দায়িত্ব বদল: বাড়ি চলে গিয়েছিলেন দুই গেটম্যান, কুমিল্লায় ট্রেন-বাস সংঘর্ষ

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
প্রকাশঃ
অ+ অ-
কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে বাস–ট্রেন সংঘর্ষের পর দুর্ঘটনা কবলিত বাস সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে | ফাইল ছবি

কুমিল্লার পদুয়ায় বাজার রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকার কথা ছিল গেটম্যান মো. মেহেদী হাসান ও মো. হেলাল উদ্দিনের। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে টাকার বিনিময়ে নাজমুল হোসেন ও কাউসার হোসেন নামের অন্য দুই গেটম্যানের সঙ্গে তাঁরা দায়িত্ব বদল করেন। এরপর মেহেদী ও হেলাল বাড়ি চলে যান। দায়িত্ব নেওয়া নাজমুল ও কাউসার সেই রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ট্রেন আসার সময় প্রতিবন্ধক (ব্যারিয়ার) না ফেলায় রেললাইনের ওপর যাত্রীবাহী বাস উঠে পড়ে। এতে ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে শিশুসহ ১২ জন যাত্রী প্রাণ হারান।

ঈদুল ফিতরের দিন ২১ মার্চ দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। ট্রেনটি বাসটিকে ইঞ্জিনের সামনে আটকে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে দৈয়ারা নামক স্থানে টেনে নিয়ে থামে। এতে বাসটি দুমড়েমুচড়ে ৩ শিশুসহ ১২ জন মারা যান। এই ঘটনায় বাসের চালকসহ অন্তত ২৪ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। হতাহতরা সবাই ছিলেন বাসের যাত্রী।

দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে রেলওয়ের তদন্ত কমিটি চার গেটম্যানের চরম অবহেলা খুঁজে পেয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল রেলওয়ে। কমিটি সম্প্রতি এই প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্তে রেলের কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী আনিসুজ্জামানকেও দুর্ঘটনার জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে। কারণ, গেটম্যানদের তদারকির দায়িত্ব এই বিভাগের ওপরই ছিল।

এই ঘটনায় নিহত এক বাসযাত্রীর স্বজনের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ওই রেলক্রসিংয়ের তিন গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব ও পুলিশ। রেলওয়ের তদন্ত কমিটির প্রধান আনিসুর রহমান বলেন, ট্রেন ও বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করার পাশাপাশি যাঁদের দায়িত্বহীনতার কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু সুপারিশও দিয়েছেন তাঁরা। তবে তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য জানাতে তিনি রাজি হননি।

 রেললাইনে এসে পড়া বাসটিকে টেনেহিঁচড়ে অনেক দূর নিয়ে যায় ট্রেনটি | ফাইল ছবি

 তদন্ত কমিটি চার গেটম্যানের মধ্যে মো. হেলাল উদ্দিনের জবানবন্দি নিয়েছে। কমিটির কাছে তিনি দাবি করেন, শুক্রবার রাতের পালায় দায়িত্ব পালন করে তিনি চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। শনিবার রাতের দায়িত্ব পালন করতে নাজমুল ও কাউসার হোসেনকে বলেন। বিনিময়ে তাঁদের এক হাজার টাকা দেন। কিন্তু নাজমুল ও কাউসার দুজনই দায়িত্ব পালন না করে রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। ফলে ট্রেন আসার সময় তাঁরা গেট ফেলতে পারেননি এবং এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষের পেছনে মূলত চারটি কারণ রয়েছে। এগুলো হলো—রেলওয়ের চার গেটম্যানের নিয়ম ভেঙে দায়িত্ব বদল করা, রেলক্রসিংয়ে সময়মতো প্রতিবন্ধক দণ্ড না ফেলা, রেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তদারকিতে ব্যর্থতা এবং বাসচালকের বেপরোয়া গতি। এসব কারণেই সংঘর্ষে বাসের ১২ যাত্রী নিহত এবং ২৪ জন আহত হয়েছেন।

এই ঘটনায় গঠিত কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিও প্রায় একই ধরনের কারণ খুঁজে পেয়েছে। তবে তাদের প্রতিবেদনে সহকারী স্টেশন মাস্টার, ট্রেনচালক ও সহকারী ট্রেনচালকের অবহেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রেলওয়ের তদন্তে কেবল মানুষের গাফিলতিই নয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতার চিত্রও ফুটে উঠেছে। ই/৪৭ স্পেশাল গেটে বিদ্যুৎ না থাকায় সতর্কঘণ্টা (অ্যালার্ম বেল) ও বিশেষ ফোন কাজ করছিল না। গেটম্যানদের থাকার ঘরে টয়লেট, পানি ও বিদ্যুতের সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। রেলের প্রকৌশল বিভাগের এসব তদারকি করার কথা থাকলেও তাঁরা তা করেননি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গেটে কোনো ফোন সেট পাওয়া যায়নি এবং দায়িত্বরত কর্মীরা ঠিকমতো কাজ করছেন কি না, তা নিশ্চিত করার মতো তদারকি ব্যবস্থাও ছিল না। কমিটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাসটি নিয়ম অনুযায়ী উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেটি নিচ দিয়ে রেলক্রসিং ব্যবহার করেছে।

দুর্ঘটনার পর রেললাইনে উৎসুক জনতার ভিড় | ফাইল ছবি

তদন্ত প্রতিবেদনে গেটম্যানদের পাশাপাশি এই দুর্ঘটনার জন্য বাসচালককেও দায়ী করা হয়েছে। এতে বলা হয়, চালক যদি সতর্কতামূলক সংকেত বোর্ড মেনে চলতেন এবং মোটরযান আইনের নিয়ম অনুযায়ী রেলক্রসিং পার হতেন, তবে এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। এ কারণে বাসচালককেও সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সংঘর্ষে ওই চালক নিজেও গুরুতর আহত হয়েছেন।

কুমিল্লার এই ভয়াবহ ট্রেন-বাস সংঘর্ষের ঘটনায় জেলা প্রশাসনও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির সদস্যরা দুর্ঘটনার পেছনে নানা অবহেলার তথ্য তুলে ধরেছেন। তদন্তে চার গেটম্যান—হেলাল উদ্দিন, মেহেদী হাসান, কাউসার হোসেন ও নাজমুল হোসেনের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রায় একই ধরনের গাফিলতি ছিল লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টারেরও। এ ছাড়া ট্রেনের দুই চালকের অবহেলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাকবলিত বাসের চালকের অদক্ষতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার বিষয়টিও উঠে এসেছে। রেলক্রসিংয়ে ওঠার আগে চালকের উচিত ছিল দুই পাশ ভালোভাবে দেখে নেওয়া, যা তিনি করেননি। ওই এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চার লেনের উড়ালসড়ক রয়েছে। বাসটির মূলত উড়ালসড়ক দিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও চালক নিচ দিয়ে যাওয়ায় এতগুলো মানুষের প্রাণ গেছে।

পদুয়ার বাজার এলাকায় বর্তমানে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ইউলুপ তৈরির কাজ চলছে। এই কাজের জন্য রেলক্রসিংয়ের পাশে দুটি ঘর তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে ক্রসিং থেকে রেললাইন স্পষ্ট দেখা যায় না। এখানে সওজ ও রেলওয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন