ডিজেল নেই, ঢাকার মশা নিধন কার্যক্রম থমকে যাওয়ার পথে
![]() |
| ঢাকার আজিমপুর দক্ষিণ কলোনি সরকারি কোয়ার্টারে গাছপালা ও ঝোপঝাড় অনেক। এরমধ্যে মশার ওষুধ দিচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিধনের কর্মীরা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে এখন জ্বালানি তেলের জন্য বিক্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘ সারি একটি নিয়মিত চিত্র। এই পরিস্থিতির মধ্যে ডিজেল সংকটে ঢাকায় মশা মারার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই সিটি করপোরেশনে যন্ত্রের মাধ্যমে ওষুধের ধোঁয়া তৈরি করে উড়ন্ত মশা নিধন করা হয়। প্রতিদিন বিকেলে চালানো এই কার্যক্রমকে ‘ধোঁয়া ছিটানো’ বলা হয়। এই ধোঁয়া তৈরির ওষুধ প্রস্তুত করতে ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু ঠিকাদারেরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটিতে ধোঁয়া ছিটানোর জন্য বর্তমানে প্রায় সোয়া তিন লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রয়োজন দুই লাখ লিটার। প্রয়োজনীয় এই জ্বালানি সংগ্রহ করতে ঠিকাদারের পাশাপাশি দুই সিটি কর্তৃপক্ষও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মশা মারার এই কার্যক্রমে মেলাথিয়ন ব্যবহার করে। প্রতি এক লিটার ডিজেলের সঙ্গে ৫ শতাংশ হারে এই ওষুধ মেশানো হয়। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ব্যবহার করে ডেলটামেট্রিন। সেখানে প্রতি লিটার ডিজেলের সঙ্গে ডেলটামেট্রিন মেশানো হয় শূন্য দশমিক ১ মিলিলিটার।
ঢাকা উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ডে ধোঁয়া ছিটানোর কাজে প্রতিদিন ১ হাজার ১০০ লিটার ডিজেলমিশ্রিত মেলাথিয়ন লাগে। গত ৩০ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরে প্রায় ২৭ হাজার লিটার মেলাথিয়ন জমা ছিল, যা দিয়ে অন্তত ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত মশা মারার কাজ চালানো সম্ভব।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ওয়ার্ডের সংখ্যা ৭৫টি। সেখানে প্রতিদিন কী পরিমাণ ডেলটামেট্রিন প্রয়োজন হয় বা বর্তমানে কী পরিমাণ মজুত আছে, সে তথ্য কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, মাসখানেক কার্যক্রম চালানোর মতো ওষুধ তাঁদের কাছে রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে মশার উপদ্রব বেশ বেড়েছে। ফলে মশা নিধন অভিযান আরও জোরালো করার দাবি উঠেছে সব মহলে। কিন্তু এমন সময়ে ডিজেলের এই সংকট মশার উপদ্রব আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ভয় তৈরি করেছে।
![]() |
| জেনারেটর চালাতে ডিজেল লাগে, তা কিনতে মেশিন নিয়ে লাইনে। ঢাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন প্রতিদিনের চিত্র। ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন, ৩০ মার্চ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে বিবেচনায় গত ১২ মার্চ নতুন করে মেলাথিয়ন কিনতে ১৬ কোটি ২৯ লাখ টাকার একটি কাজ বরাদ্দ দেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভান্ডার ও ক্রয় বিভাগ। এই আদেশের মাধ্যমে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এম আর এন্টারপ্রাইজকে আগামী ১১ মের মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার মেলাথিয়ন দিতে বলা হয়। কাজের শর্ত অনুযায়ী, সরবরাহকারীকে মেলাথিয়নের সঙ্গে ডিজেল মিশিয়েই তা জমা দিতে হবে। এরই মধ্যে ওষুধের পরিমাণ কমে আসায় দ্রুত সরবরাহ শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দিচ্ছেন উত্তর সিটির কর্মকর্তারা।
এদিকে ডিজেল সংকটের কারণে ওষুধ সরবরাহ করতে না পারার বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছেন সরবরাহকারী হাবিবুর রহমান গাজী। প্রয়োজনীয় ডিজেল পেতে সুপারিশ চেয়ে একটি আবেদনও করেছেন তিনি। গত মঙ্গলবার করা ওই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, মেলাথিয়ন তৈরির জন্য তিনি প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না।
আবেদনে আরও জানানো হয়, ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটার মেলাথিয়ন প্রস্তুত করতে ৩ লাখ ২৭ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন। এই পরিমাণ ডিজেল পেতে প্রশাসক যেন সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর কাছে সুপারিশ করেন, সেই অনুরোধ জানিয়েছেন সরবরাহকারী।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, ডিজেলের ব্যবস্থার জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও সরকারি তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, ৭ এপ্রিলের মধ্যে সরবরাহকারীরা ডিজেল পেয়ে যাবেন। ফলে কোনো সংকট হবে না।
তবে গত ১১ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতে মশার ওষুধ ডেলটামেট্রিন তৈরির জন্য দুই লাখ লিটার ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৬ লাখ ২১ হাজার ৫২০ লিটার ডেলটামেট্রিন সরবরাহের জন্য ফরোওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে দুই লাখ লিটার ওষুধ দিতে বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ওষুধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।
চিঠিতে আরও বলা হয়, গত বছরের তুলনায় এবার মশার উপদ্রব বেড়েছে। ডিজেল না পাওয়া গেলে মশা মারার কাজ বাধাগ্রস্ত হবে এবং এতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
ডিজেল সংকটের কোনো সমাধান হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জহিরুল ইসলাম জানান, সমস্যার সমাধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির কাছে দুই থেকে আড়াই মাসের ওষুধ জমা আছে জানিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, এর মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে গেলে মশা মারার কাজে কোনো সমস্যা হবে না।


Comments
Comments