[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

২৫০ টাকার হেলমেট বিক্রি হচ্ছে ৭ হাজার টাকায়!

প্রকাশঃ
অ+ অ-
২০২৫ সালে ৩,০২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ২,৬৭২ জন, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬%
ডব্লিউএইচও’র নির্দেশিকা অনুযায়ী, মানসম্মত হেলমেট পরলে মৃত্যুঝুঁকি ছয় গুণের বেশি কমে। আর মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি কমে ৭৪%
Helmet Illustration

ঢাকার মিরপুরের ৬০ ফুট সড়কে একটি মানসম্মত হেলমেট কিনতে গিয়েছিলাম। স্পেনের পরিচিত ব্র্যান্ড ‘এমটি’-র একটি হেলমেটের দাম বিক্রেতা চাইলেন ৭ হাজার টাকা। তিনি আরও জানালেন, বেশ ভালো মানের হেলমেটের দাম ২০ হাজার টাকার বেশি এবং ৮০ হাজার টাকার হেলমেটও আছে।

স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল হলো, মোটামুটি ভালো মানের হেলমেটের এত দাম কেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) খোঁজ নিয়ে জানা গেল, একটি কোম্পানি এমটি ব্র্যান্ডের প্রতিটি হেলমেট আমদানির দাম দেখিয়েছে মাত্র ২ মার্কিন ডলার বা ২৫০ টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হেলমেট আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি দিতে প্রকৃত দামের চেয়ে অনেক কম দাম দেখিয়ে আমদানি করা হচ্ছে।

হেলমেট মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীর প্রাণ বাঁচায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালে নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ‘সড়ক নিরাপত্তা নির্দেশিকা’ প্রকাশ করে। সেখানে বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের বড় কারণ মাথায় আঘাত। মানসম্মত হেলমেট পরলে মৃত্যুঝুঁকি ছয় গুণের বেশি কমে, আর মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি কমে ৭৪ শতাংশ।

মানসম্মত হেলমেট যেখানে মানুষের প্রাণ বাঁচায়, সেখানে বাংলাদেশের হেলমেটের বাজার তিন ধরনের অনিয়মে ভরা। প্রথমত, বাজারে বিক্রি হওয়া হেলমেটের বড় অংশ মানসম্মত নয়। ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেও হেলমেট পাওয়া যায়, যা আসলে প্লাস্টিকের টুপির মতো। দ্বিতীয়ত, হেলমেট খুব কম দামে আমদানি দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। এতে নিয়ম মেনে চলা আমদানিকারক ও দেশীয় উৎপাদকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। অথচ বাজারে এসব হেলমেট চড়া দামে বিক্রি হয়। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) হেলমেটের মান পরীক্ষা করার কথা থাকলেও বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন ছাড়া অহরহ হেলমেট বিক্রি হচ্ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শহরে মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে হেলমেট পরার প্রবণতা দেখা যায়। তবে আরোহীর ক্ষেত্রে অনেক সময় তা থাকে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হেলমেট পরার হার আরও কম। তিনি আরও বলেন, চালকেরা যে হেলমেট পরেন, তার অনেকগুলোই আসলে কেবল প্লাস্টিকের ক্যাপ বা টুপি।

এনবিআর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৯ লাখ ৭১ হাজার হেলমেট আমদানি করা হয়েছে। ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ১৯ হাজার। এসব হেলমেটের বড় অংশই আসে ভারত ও চীন থেকে। 

কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, ভারতের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ভেগা, স্টিলবার্ড, স্টাডস ও গ্লাইডার্সের হেলমেট আমদানির সময় প্রতিটির দাম মাত্র ২ থেকে ৩ ডলার (২৫০ থেকে ৩৭০ টাকা) দেখানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ না করে শুধু ‘হেড সেফটি গিয়ার’ লিখে আমদানি করা হচ্ছে। অথচ দেশের খুচরা দোকানে একই হেলমেট ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অন্যদিকে, কিছু আমদানিকারক প্রতিটি হেলমেট ২৪ ডলার (২ হাজার ৯৪০ টাকা) দাম দেখিয়েও আমদানি করেছেন।

হেলমেট আমদানিতে মোট শুল্ক-কর ৫৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই মোটা অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি দিতেই হেলমেটের দাম অস্বাভাবিক কম দেখানো হয়। বাকি অর্থ লেনদেন হয় অবৈধ পথে, যা মূলত অর্থ পাচার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি’ (জিএফআই) গত ২৬ মার্চ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা।

শুল্ক ফাঁকির কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। দেশে হেলমেট তৈরির কারখানা স্থাপন করেছে ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌকিরুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত দামের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে (আন্ডার ইনভয়েসিং) পণ্য আমদানির কারণে তাঁরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। এ ছাড়া আমদানির সময় হেলমেটের মান যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হেলমেট আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি বন্ধ করতে তদারকি বাড়ানো জরুরি। কারা কত দামে হেলমেট আনছে, তার সব তথ্য কাস্টমসের তথ্যভাণ্ডারে রয়েছে। মাত্র ২ ডলার দাম দেখিয়ে যাঁরা নামী ব্র্যান্ডের হেলমেট আনছেন, তাঁদের তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে হেলমেট আমদানিতে একটি সর্বনিম্ন শুল্কায়ন মূল্য (মিনিমাম অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু) নির্ধারণ করা দরকার।

বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক ৩১৫টি পণ্যের তালিকায় হেলমেট অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ হলো, হেলমেট আমদানি বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে অবশ্যই মান পরীক্ষা করাতে হবে এবং বিএসটিআইয়ের মানচিহ্নযুক্ত হেলমেটই কেবল বাজারে ছাড়া যাবে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ হেলমেটেই এই মানচিহ্ন থাকে না।

বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, হেলমেটের মান পরীক্ষার জন্য গত বছরের শেষ দিকে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি পরীক্ষাগার চালু করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র ছাড়া বৈধভাবে আমদানিকৃত হেলমেট বাজারে বিক্রির সুযোগ নেই। এমনকি দেশে উৎপাদনের ক্ষেত্রেও লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক।

তবে বাজারে সস্তায় মানহীন হেলমেট দেদার বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ইসিই বা ডট -এর মতো আন্তর্জাতিক মানচিহ্নগুলোও নকল করা হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে যাচাই করা বেশ কঠিন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত প্রায় ৬৬ লাখ যানবাহনের মধ্যে ৪৮ লাখ ৭১ হাজারই মোটরসাইকেল, যা মোট যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, চার চাকার যানের তুলনায় মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের ঝুঁকি অনেক বেশি। বাংলাদেশে এই দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পাওয়ার ঘটনা খুবই সাধারণ। তাই মানসম্মত হেলমেট সহজলভ্য করা এবং এর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি হেলমেটের মান নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরীক্ষা এবং বাজারে নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন