কয়রায় সাতহালিয়ার পুকুরই ভরসা: ড্রামে ভরে পানি বিক্রি করছেন ‘ফেরিওয়ালারা’
![]() |
| খুলনার কয়রা উপজেলায় সুপেয় পানির সংকট। পুকুর থেকে প্লাস্টিকের ড্রামে পানি তুলে ভ্যানে বোঝাই করা হচ্ছে। এগুলো বিভিন্ন দোকান ও বাড়িতে বিক্রি করা হবে। শুক্রবার সকালে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি। খুলনার কয়রা উপজেলার সাতহালিয়া গ্রামের সরকারি পুকুরপাড়ে দেখা গেল প্রচণ্ড ব্যস্ততা। পুকুর থেকে প্লাস্টিকের ড্রামে পানি তুলছেন ইয়াসিন আলী। পাশে ভ্যানে সেই ড্রামগুলো সাজিয়ে রাখছেন কামরুল গাজী। কিছুক্ষণ পর ভ্যানটি পানিভর্তি ড্রামে ভরে গেল। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে সেটিকে রওনা করানোর প্রস্তুতি চলছে।
শুক্রবার সকালের এই চিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে কামরুল গাজী বলেন, ‘এই পানি আশপাশের গ্রামে বিক্রি করি। মানুষ এই পুকুরের পানিই পান করে, কারণ অন্য কোনো উপায় নেই। ৩০ লিটারের একেকটি ড্রাম ১০ টাকায় বিক্রি করি। তবে দূরে নিতে হলে দাম আরও বেশি পড়ে।’
ইয়াসিন আলী বলেন, ‘সাত বছর ধরে এই কাজ করছি। ভোরে উঠে পুকুর থেকে পানি তুলি, তারপর ভ্যানে করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিই। পানি বিক্রির ফাঁকে সময় পেলে যাত্রীও টানি। এলাকায় পানির কষ্ট আগে থেকেই ছিল, তবে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে সমস্যা আরও বেড়েছে।’
ইয়াসিন আলী ও কামরুল গাজী এলাকায় এখন পানির ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ভোরে তাঁরা সাতহালিয়ার সরকারি পুকুরে এসে ড্রাম ভর্তি করেন। এরপর ভ্যান ঠেলে পার্শ্ববর্তী চৌকুনি, বগা, কালিকাপুর, বাবুরাবাদসহ আশপাশের গ্রামে যান। প্রথমে গ্রামের দোকানগুলোয় পানি সরবরাহ করেন, পরে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন। প্রতিবার ভ্যানে সাতটি ড্রাম নেওয়া যায়। দিন শেষে তাঁদের আয় হয় প্রায় ৫০০ টাকা।
পুকুরপাড় থেকে একটু এগোতেই দেখা গেল, এক নারী কলসি হাতে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল-বিকেল পানি আনতে হয়। এলাকায় কোনো নলকূপে মিষ্টি পানি ওঠে না, সব নোনা। তাই বাধ্য হয়ে পুকুরের পানি পান করি। যেদিন আনতে পারি না, সেদিন কিনে খেতে হয়। একে তো পুকুরের পানি, তাও কিনে খেতে হচ্ছে।’
সাতহালিয়া থেকে পূর্ব দিকে সুন্দরবনঘেঁষা নয়ানী গ্রামেও একই চিত্র দেখা গেছে। গ্রামের শেফালী মণ্ডল নামের এক নারী সুপেয় পানির কষ্ট দেখানোর জন্য প্রতিবেদককে সড়কের ওপর থেকে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান। শেফালী মণ্ডলের ঘরে ঢুকলে বোঝা যায়, পানির সমস্যা তাঁদের কতটা সংকটে ফেলেছে। ঘরের ভেতরে কলসি, ড্রাম, এমনকি গামলায় পর্যন্ত পানি জমিয়ে রাখা হয়েছে।
শেফালী মণ্ডল বলেন, ‘ঘরে এক বেলা খাবার জোগাড় করার চেয়েও মিষ্টি পানি জোগাড় করা এখন বেশি কঠিন। এখানে একফোঁটা পানির অনেক দাম। কখনো হেঁটে, আবার কখনো ভ্যানে করে পানি আনতে হয়। ৩০ লিটার পানির জন্য ১৫ টাকা দিতে হয়। এ জন্য পানি মেপে মেপে খরচ করি, অনেক সময় তৃষ্ণা মেটে না। পরিবারের আয়ের ২০ থেকে ২৫ শতাংশই শুধু পানির পেছনে চলে যাচ্ছে।’
একই গ্রামের গৃহবধূ লাকি মণ্ডল জানান, তাঁকে দুই-তিন মাইল দূর থেকে পানি আনতে হয়। বৃষ্টি না হলে তাঁদের এই কষ্ট কমে না। বাড়িতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বড় পাত্র থাকলেও সেখানের পানি ফুরিয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়রা উপজেলার অধিকাংশ এলাকায় নলকূপে মিষ্টি পানি পাওয়া যায় না। মাটির নিচের পানি লবণাক্ত হওয়ায় পুকুরই এখন তাঁদের একমাত্র ভরসা। তবে অনেক পুকুর শুকিয়ে গেছে, আবার যেগুলোতে পানি আছে সেগুলোও পানের জন্য নিরাপদ নয়। কোথাও কোথাও আগে বসানো পুকুরের পানি পরিশোধন যন্ত্রগুলোও এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
কয়রার শাকবাড়িয়া নদীর তীরের এক দোকানি শশাঙ্ক শেখর চক্রবর্তী বলেন, ‘দোকানের জন্য প্রতিদিন পানি কিনতে হয়। ৩০ লিটার পানির দাম ১২ টাকা হলেও তা বয়ে আনতে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে পুকুর খনন, পানি পরিশোধন যন্ত্র বসানো এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখা জরুরি।’
![]() |
| এলাকার নারীরা পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করেন। শুক্রবার কয়রা উপজেলার সাতহালিয়া গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, ‘২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে সুপেয় পানির সংকট বেড়েই চলেছে। অধিকাংশ এলাকায় সুপেয় পানি মানেই পুকুরের পানি, যা কখনো নিজের কাঁধে বয়ে আনতে হয়, আবার কখনো কিনে খেতে হয়। পানির এই অভাব এখানে এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুকনো মৌসুম এলেই এই কষ্ট আরও বেড়ে যায়।’
তবে কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলছে। লবণাক্ততার কারণে অধিকাংশ জায়গায় গভীর নলকূপ কাজে আসছে না। তাই পুকুর খনন, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং পানির ট্যাংক বিতরণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে পানের যোগ্য পানি পাচ্ছে।’


Comments
Comments