আইসিডি চলছে ৩ বছর, অথচ হয়নি কোনো দরপত্র
![]() |
| ঢাকার কমলাপুর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ঢাকার কমলাপুর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোর (আইসিডি) নতুন পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া তিন বছরেও শেষ করতে পারেনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিশেষ শর্ত, আইনি জটিলতা ও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে দরপত্র কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। আদালতের সবশেষ আদেশে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আগামী ২০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমান এই অচলাবস্থা কাটাতে বিকল্প পথ খুঁজছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তারা ঢাকার এই কনটেইনার ডিপো পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল যে মডেলে চালানো হয়, সেই একই নিয়মে কমলাপুর আইসিডিও নৌবাহিনীর কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি দ্রুতই বন্দরের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তোলা হতে পারে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিবহন বিভাগের পরিচালকের সই করা গত ২৯ মার্চের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানামার কাজে পাঁচ বছরের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র কার্যক্রম আদালতের নির্দেশে ২০ মে ২০২৬ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্তমান পরিচালক প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের করা মামলার কারণে আদালত এ পর্যন্ত তিনবার স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। ফলে দরপত্র প্রক্রিয়া বারবার পিছিয়েছে। এরই মধ্যে আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও নতুন কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে প্রায় তিন বছর ধরে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে একই প্রতিষ্ঠান কমলাপুর আইসিডি পরিচালনা করে আসছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র ও সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘বর্তমান পরিচালক প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেকের করা একটি মামলার কারণে আদালত আবারও দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত করেছেন। কমলাপুর আইসিডি সারা দেশের পণ্য পরিবহনের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। তাই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে কমলাপুর আইসিডি পরিচালনায় অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।’
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর চাপ কমাতে ১৯৮৭ সালে কমলাপুর রেলওয়ে আইসিডি চালু করা হয়। এই আইসিডিতে ২০১৩ সাল থেকে ১০ বছরের চুক্তিতে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানামার কাজ করে আসছে সাইফ পাওয়ারটেক। চুক্তির মেয়াদ ২০২৩ সালে শেষ হয়ে গেলে নতুন করে পাঁচ বছরের জন্য পরিচালক নিয়োগে ওই বছরের ১৮ জুন প্রথম দরপত্র আহ্বান করে চট্টগ্রাম বন্দর। তবে শুরু থেকেই এই দরপত্র নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। দরপত্রের নথিতে আবেদনকারীর অভিজ্ঞতার জন্য এমন কিছু শর্ত রাখা হয়, যা অনেকের কাছে অস্বাভাবিক ও একপেশে বলে মনে হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, আবেদনকারীকে একই ধরনের কাজে প্রধান ঠিকাদার হিসেবে অভিজ্ঞ হতে হবে এবং চুক্তির অন্তত ৭০ শতাংশ কাজ শেষ করার রেকর্ড থাকতে হবে।
দেশের বেসরকারি আইসিডি মালিক ও রসদ সরবরাহ খাতের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এ ধরনের শর্ত বাস্তবে অন্য প্রতিযোগীদের বাইরে রাখার জন্যই দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি, দরপত্রে এমনভাবে রেলওয়ের ওয়াগন থেকে কনটেইনার ওঠানামার অভিজ্ঞতা যুক্ত করা হয়, যাতে কার্যত সাইফ পাওয়ারটেক ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে না পারে। এ নিয়ে আইসিডি মালিকেরা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিটে লিখিত আপত্তি জানান। আপত্তির মুখে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রথম দরপত্র বাতিল করে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করলেও অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও একই ধরনের শর্ত রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রামের বেসরকারি আইসিডি ও জাহাজ থেকে পণ্য খালাসকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরেই একই ধরনের কনটেইনার ওঠানামার কাজ করছে এবং একই ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছে। ফলে কমলাপুর আইসিডির জন্য আলাদা করে এমন বিশেষ অভিজ্ঞতার শর্ত দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আগের দরপত্র কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে পাঁচ বছরের জন্য পরিচালক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তখন বহুল আলোচিত বিশেষ শর্তটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশা তৈরি হয় যে এবার উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। কিন্তু একের পর এক মামলার কারণে গত এক বছর ধরেও প্রক্রিয়াটি আটকে আছে।
এ বিষয়ে সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘রেলপথে কনটেইনার পরিবহন খুবই সংবেদনশীল কাজ। এই অভিজ্ঞতা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। কিন্তু পরে দরপত্রে রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের অভিজ্ঞতার শর্ত তুলে দেওয়া হয়। তাই আমরা আদালতে গেছি।’
কমলাপুর আইসিডি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর মোট ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৬টি একক কনটেইনার নাড়াচাড়া করেছে। এর মধ্যে কমলাপুর আইসিডিতে নাড়াচাড়া হয়েছে ৭২ হাজার ৯৯৮টি একক কনটেইনার।

Comments
Comments