গ্রামে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না
![]() |
| বিদ্যুৎ | প্রতীকী ছবি |
বিদ্যুতের ভোগান্তি বেড়েছে। তবে শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং অনেক বেশি। শহরে দিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রামে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ময়মনসিংহ, খুলনা ও রংপুর বিভাগে ভোগান্তি তুলনামূলক বেশি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়ায় গ্রামগঞ্জের মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থদের কষ্টের সীমা নেই। ব্যাহত হচ্ছে ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে কয়লার অভাব। এতে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আসা বন্ধ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ হলেও ঘাটতি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে এই লোডশেডিং সব এলাকায় সমানভাবে হচ্ছে না। রাজধানীসহ জেলা শহরগুলোতে নামমাত্র লোডশেডিং দিয়ে গ্রাম্য এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পরিচালক (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ার ও কক্সবাজারের মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চাহিদামত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আসছে না। এই দুটি কেন্দ্রে কয়লা আমদানি ব্যাহত হওয়ায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন কম হচ্ছে। পটুয়াখালীর নোরিনকো কেন্দ্রটিও কয়লা সংকটে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছে। এছাড়া কারিগরি ত্রুটির কারণে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। এসব কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তিনি জানান, রামপালের বন্ধ ইউনিটটি রাতে চালু হতে পারে, যা কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শহরে লোডশেডিং না করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এ মাসে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। মাসের শুরুতে এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হলেও এখন তা দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। তেল ও গ্যাসের অভাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। পিডিবি ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে ৯২-৯৩ কোটি ঘনফুট। খরচ বেশি হওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কম চালানো হচ্ছে। এছাড়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিল বকেয়া থাকায় উদ্যোক্তারা তেল আমদানির ঋণপত্র খুলতে পারছেন না।
গত রোববার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ১০৩ মেগাওয়াট। সেদিন চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট। সোমবার ঘাটতি ছিল এক হাজার ১০০ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের ছুটিতে চাহিদা কম থাকলেও এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। বুধবার বিকেলে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। সন্ধ্যায় চাহিদা বাড়লে এই ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।
বরিশাল
নববর্ষের প্রথম দিন মঙ্গলবার বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার মানুষ প্রায় ১২ ঘণ্টা অন্ধকারে ছিলেন। পিরোজপুরের উদয়কাঠি গ্রামের বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন সরদার জানান, বিদ্যুৎ যেন লুকোচুরি খেলছে। দিনরাতে পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যায় এবং একবার গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর আসে।
বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার বলেন, তাঁর এলাকায় গভীর রাতে ৮৫ থেকে ৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট। দিনের ব্যস্ত সময়ে চাহিদা আরও বাড়লেও সরবরাহ বাড়ে না। বরিশাল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তাঁর এলাকায় ৪৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ২০ মেগাওয়াট। বিকেলে তাঁর এলাকার ৯টি ফিডারে একযোগে লোডশেডিং চলছিল।
পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তাদের মতে, পিরোজপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় ৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৪ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
জেলা শহরগুলোতে লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. আলতাপ হোসেন জানান, তাঁর সমিতির গ্রাহকদের জন্য প্রতিদিন ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট।
পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির বরগুনা অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, তাঁদের গ্রাহকদের চাহিদা সাড়ে সাত মেগাওয়াট হলেও পাচ্ছেন ৩ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। বরগুনা পল্লী বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, সেখানে ১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
রংপুর
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর মহাব্যবস্থাপক আশরাফ আলী বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে না। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে মাঝারি ধরনের লোডশেডিং চলছে।
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফজলুর রহমান বলেন, শহরে বিদ্যুতের চাহিদা ১৪ মেগাওয়াট হলেও পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ৮ থেকে ৯ মেগাওয়াট। গাইবান্ধা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক সানজিদ কুমার বলেন, বর্তমানে গ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা ৬০ মেগাওয়াট হলেও গড়ে ৪০ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার খোলাহাটি গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বোরো চাষে সব সময় জমিতে পানি রাখতে হয়। কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। শহরের ব্রিজ রোডের ব্যবসায়ী ছবেদুল মিয়া বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ চলে যায়। ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হওয়ার ভয় পাচ্ছেন তিনি।
কুড়িগ্রামের ঝালাই মিস্ত্রি শুভ দাস জানান, বিদ্যুৎ গেলে দুই ঘণ্টা পর আসে, ফলে কাজ সময়মতো শেষ হয় না। ফ্রিল্যান্সার অমিত পাল বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের সময়মতো কাজ বুঝিয়ে দিতে সমস্যা হচ্ছে। নেসকোর কুড়িগ্রাম কার্যালয় জানায়, জেলায় ৭০-৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৪০-৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
রাজশাহী
বগুড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, তাঁদের ৯৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৯০ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার বিকেল পর্যন্ত শহরে পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে, যা সব মিলিয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা।
একই অবস্থা নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁতে। বিশেষ করে লালপুর, রাণীনগর, সিংড়া ও উল্লাপাড়ায় লোডশেডিং অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এসব উপজেলায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
নাটোরের লালপুর উপজেলার ফুলবাড়ী গ্রামের গৃহিণী তাবাছুম জান্নাত বলেন, ‘সারাদিনে কতবার বিদ্যুৎ যায়, তার হিসাব নেই। রাতেও পাঁচ-ছয়বার বিদ্যুৎ চলে যায়। গরমের কারণে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না, পড়াশোনা ও গৃহস্থালি কাজও ব্যাহত হচ্ছে।’
লালপুরের অটোরিকশাচালক সোহেল আলী বলেন, রাতে ৫-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অটোর ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ হচ্ছে না। এতে যাত্রী পরিবহন করতে না পারায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কসবাপাড়া গ্রামের গভীর নলকূপের মালিক আনিছুর খান বলেন, প্রায় ২৯০ বিঘা বোরো জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতি চললে ধানের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেট
সিলেট বিভাগে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান ৩০ শতাংশ। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, জগন্নাথপুর, জুড়ী, ধর্মপাশা, মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় দিনের অর্ধেকের বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলায় প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ১৫০ থেকে ১৫৫ মেগাওয়াট এবং বিভাগে ২৪০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জেলায় ১১০ এবং বিভাগে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সিলেট বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে গত মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত অন্তত পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে। একেকবার বিদ্যুৎ গেলে তা দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় আসেনি। ধর্মপাশার গাছতলা বাজারের ইলেকট্রিক ব্যবসায়ী আশরাফুল আলম বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিনটি উপজেলায় তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর আওতাধীন হোমনায় ২০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ থেকে ১০ মেগাওয়াট। মেঘনায় ১১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৪ মেগাওয়াট।
বাঞ্ছারামপুর জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে গড়ে সদরে ৬৭ শতাংশ এবং ফরদাবাদে ৪৫ শতাংশ লোডশেডিং চলছে। বাঞ্ছারামপুরের রূপসদী দক্ষিণপাড়ার সেচ ব্যবস্থাপনাকারী সালেহ আহমেদ জানান, দিনরাত বিদ্যুৎ না থাকায় জমিতে ঠিকমতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো পানি না পাওয়ায় কৃষকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
ফরদাবাদ গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা রাশিদা আক্তার বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। একবার গেলে কয়েক ঘণ্টা পর আসে। গরমে রাতে ঘুমানো এবং দিনে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পৌর এলাকার মাহফুজ আহমেদ জানান, মঙ্গলবার সারা রাতে মাত্র দুই-আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ঘরে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
ঢাকা
ঢাকা বিভাগের পাঁচটি জেলা ও আটটি উপজেলায় লোডশেডিং পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তবে দু-একটি জেলা ও উপজেলা শহরে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। আলফাডাঙ্গা, গোয়ালন্দ, বাজিতপুর, বোয়ালমারী, শিবালয় ও লৌহজংয়ে চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে লোডশেডিং কিছুটা সহনীয়।
পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির গোপালগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মঈন উদ্দিন বলেন, শহরে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কিশোরগঞ্জে সাড়ে ২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলছে। জেলার পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৬০ মেগাওয়াট। রাজবাড়ী জেলায় ৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে ৭০ মেগাওয়াট।
মুন্সীগঞ্জ শহরের শিক্ষার্থী নাফিসা বিনতে উর্বনা বলেন, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। মুক্তারপুর এলাকার ব্যবসায়ী হেলালউদ্দিন সরদার বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ঝালাই কারখানা, কাঠের মিল ও ছাপাখানাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় পানির পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীর বিকাশ এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিজয় সাহা বলেন, ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এতে চাল উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে গেছে। জেনারেটর চালানোর জন্য জ্বালানি তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। ভাটপাড়া এলাকার আল আলী অটো ব্রিকসের পরিচালক সবুজ মিয়া বলেন, বিদ্যুৎ ও তেলের সংকটে ইটভাটা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বোয়ালমারী সদর বাজারের ব্যবসায়ী কাজী মোহাম্মদ রায়হান বলেন, মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮ থেকে ৯ বার বিদ্যুৎ গেছে। আইপিএস ঠিকমতো চার্জ হওয়ারও সুযোগ পাচ্ছে না।
খুলনা
গত মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাঁচবার লোডশেডিং হয়েছে। সর্বনিম্ন ৩৭ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত মোট পাঁচ ঘণ্টা এসব এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। খুলনা, যশোর ও বাগেরহাটের তুলনায় সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা অঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।
পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির প্রধান প্রকৌশলী এটিএম তারিকুল ইসলাম জানান, ১৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। এই কারণে বারবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে। মাগুরা ওজোপাডিকোর প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, তাঁদের অধীনে ৯টি বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র বা ফিডার রয়েছে। ৩-৪ ঘণ্টা পরপর একেকটি কেন্দ্রে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার কমলাপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মুসাফির জানান, শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও গ্রাম এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের অবস্থা নাজুক। একবার বিদ্যুৎ গেলে তিন থেকে চার ঘণ্টা পর আসে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে, এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে ২৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ১০-১২ মেগাওয়াট। যশোরের অভয়নগরে ৩৭-৩৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫ থেকে ২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভয়নগর উপজেলার আবাচন্ডিপুর ও চালতেঘাটা এলাকার বাসিন্দারা জানান, মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে বুধবার পর্যন্ত তাঁদের এলাকায় অন্তত ১০ বার বিদ্যুৎ গেছে। গ্রামাঞ্চলে প্রতিবার বিদ্যুৎ গেলে দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। তবে পৌর সদরে লোডশেডিং ছিল ৩০ থেকে ৬০ মিনিটের মতো।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ জেলায় বিভিন্ন সময়ে ৫০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। তারাকান্দা, ফুলপুর, ধোবাউড়া, ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে লোডশেডিং পরিস্থিতি ছিল খুবই খারাপ। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে বুধবার ৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে।
এই লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ময়মনসিংহের মাছচাষিরা। সদর উপজেলার চর বড়বিলা এলাকার মাছচাষি সারোয়ার হোসেন বলেন, গরমের শুরুতে লোডশেডিংয়ের কারণে মাছ চাষে বড় সংকট তৈরি হচ্ছে। বৈশাখ মাসে পুকুরে সারাক্ষণ পানি দিতে হয়। দিনের বড় একটা সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সেচ বন্ধ থাকছে। এতে মাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যাঁরা মাছের রেণু বা পোনা উৎপাদন করেন, তাঁদের ক্ষতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

Comments
Comments