বেড়েই চলেছে দৈনন্দিন খরচ, হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ
| প্রতীকী ছবি |
দেশের বাজারে আবারও বাড়তে শুরু করেছে মানুষের দৈনন্দিন খরচ। ভোজ্যতেল, সবজি, রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে যাতায়াত—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যয়ের নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে ধীরে ধীরে দামের চাপ বাড়ছে। ফলে আয় না বাড়লেও খরচ বাড়তে শুরু করায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, এলপিজি গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়ের হিসাব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি খাতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে খোলা ভোজ্যতেলের দাম বেশ বেড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে খোলা পাম তেল ও সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজারে হঠাৎ করে প্রতি ড্রামে প্রায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যাতায়াত বা পরিবহন খরচ বাড়ছে। এর ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ঈদুল ফিতরের আগেই ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা বাড়ার প্রবণতা ছিল। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পর বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানুষের খরচ বাড়ার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসের বাজারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করেছে। নতুন ঘোষণায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। গত মাসে এর দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৩২ টাকা ৩০ পয়সা। সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজির দামে এটাই সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বিকেলে নতুন এই দাম ঘোষণা করেন, যা ওই দিন সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
নতুন হিসাব অনুযায়ী প্রতি কেজি এলপিজির দাম ঠিক করা হয়েছে ১৪৪ টাকা ৪ পয়সা। এই হারেই বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দাম নির্ধারিত হবে। তবে বাজারে সরকারি দামে গ্যাস পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি নিয়ে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে। নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ঠিক করা হয়েছে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা, যা আগের চেয়ে প্রায় ১৮ টাকা বেশি।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো—আয়ের তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা আংশিক চালু রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে উৎপাদন কমে গেছে। এতে অনেক শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শ্রমিকদের অনেকেরই অতিরিক্ত সময় বা ওভারটাইম কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মাসিক আয় কমে যাচ্ছে। একই সময়ে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও যাতায়াত খরচ বাড়ায় তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। পরিবহন খাতেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক জায়গায় যানবাহন চলাচল কমে গেছে। ফলে চালক, হেলপার এবং রাইড শেয়ারিং সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় কমছে।
এদিকে কম সংখ্যক পরিবহন চলাচল করায় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে যাত্রীদের যাতায়াত খরচ বেড়েছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডিজেল সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘জ্বালানির সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সব খাতের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে ডিজেল সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন—উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।’ তাঁর মতে, পরিবহন ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় অনেক সময় পণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। এতে সরবরাহ কমে গিয়ে বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি খাতেও পড়তে শুরু করেছে। সেচের জন্য ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা থাকায় সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এটি অন্যতম বড় খাত। ফলে কৃষি উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য সরবরাহ এবং বাজারের দামের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া সার উৎপাদন ও পরিবহনের ক্ষেত্রেও জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি খাতের উৎপাদন খরচ আরও বাড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খানের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার খরচ বাড়তে পারে। তাঁর মতে, যদি দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকে, তবে বছরে অতিরিক্ত খরচ দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত দেশের অর্থনীতিতে পড়ে।’
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘জ্বালানি এমন একটি খাত, যার সঙ্গে অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্র জড়িত। ফলে জ্বালানি সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়ে।’ তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পরিচালনা ব্যয় কমানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার। বাজেটের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন করে জ্বালানি খরচ বাড়লে অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়তে থাকলে বাজারে দ্বিতীয় ধাপের মূল্যস্ফীতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রথমে জ্বালানি ও যাতায়াত খরচ বাড়বে, এরপর পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত খাদ্য ও সেবার দামে তার প্রভাব পড়বে। এই অবস্থায় মানুষের খরচ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং উৎপাদন খাত সচল রাখার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি, পরিবহন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে দামের চাপ পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা কম। ফলে মানুষের খরচ বাড়ার এই প্রবণতা আপাতত বজায় থাকতে পারে।
Comments
Comments