সুন্দরবন এখন বসন্তের রঙে রঙিন
![]() |
| সুন্দরবনের গাছে শোভা পাচ্ছে ফুল। ২৬ মার্চ সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদীর তীরবর্তী বনাঞ্চল থেকে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বসন্তের এই সময়ে সুন্দরবন যেন নতুন সাজে সেজেছে। চারদিকে এখন ফুলের রঙ আর মৌমাছির গুঞ্জন। ডালে ডালে ফুটে থাকা খলিশা, গরান, পশুর আর হরগোজার ফুলে বনভূমি রঙিন হয়ে উঠেছে। কোথাও সবুজ পাতার ভাঁজে ছড়িয়ে আছে সাদা ছোট ছোট ফুল, কোথাওবা লালচে-গোলাপি আভায় দুলছে অন্য কোনো লবণাক্ত বনের ফুল। হালকা বাতাসে ভেসে আসছে ফুলের মিষ্টি সুবাস, আর সেই সুবাসে উড়ছে মৌমাছির দল। মধু সংগ্রহের জন্য তারা এক ফুল থেকে অন্য ফুলে ছুটে চলেছে।
কয়রা শাকবাড়িয়া নদীপথ দিয়ে সুন্দরবনে ঢুকতেই বসন্তের এই রূপ চোখে পড়ে। চারপাশে সবুজের ভেতর প্রকৃতি যেন নতুন করে সাজতে শুরু করেছে। খলিশা গাছের ছোট ছোট সাদা ফুলগুলো দূর থেকে মুক্তার মতো লাগে। গরান গাছের সাদা ফুলও খুব শান্ত আর সুন্দর, যা সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। আর পশুর গাছের ছোট ছোট ফুলগুলো দেখতে সূক্ষ্ম হলেও বেশ আকর্ষণীয়। মনে হয় বসন্তের নীরব এক সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে চারদিকে।
এই ফুলের ভিড়ে মৌমাছিদের আনাগোনা বনকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। বসন্তের এই সময়টিই সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুমের আগের মুহূর্ত।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ শুরু হয়েছে, যা চলবে টানা দুই মাস। এই বছর খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
সুন্দরবনে সাধারণত তিন প্রজাতির মৌমাছি দেখা যায়। এর মধ্যে এক প্রজাতির মৌমাছি থেকেই মূলত বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহ করা হয়। মৌসুমের শুরুতে এই মৌমাছিরা নিচু ডালে বাসা বাঁধে। মৌয়ালরা জানান, যখন বারবার একটি বাসা ভেঙে মধু সংগ্রহ করা হয়, তখন মৌমাছিরা বিরক্ত হয়ে উঁচু ডালে নতুন করে মৌচাক তৈরি করে।
বসন্তের এই সময়ে সুন্দরবনের প্রতিটি গাছ যেন একেকটি মধুর উৎস। মৌয়ালদের কাছে খলিশা ফুলের মধু সবার আগে আসে। লবণাক্ত মাটিতে জন্মানো এই মাঝারি আকৃতির গাছটি ৫ থেকে ৭ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ আর ছোট সাদা ফুলগুলো ডালে থোকায় থোকায় ফুটে অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। এই ফুলের মধু স্বচ্ছ, ঘন ও মিষ্টি। এটি অনেকটা নারিকেল তেলের মতো—ঝাঁজহীন ও হালকা স্বাদের। তবে খলিশা গাছের সংখ্যা কম হওয়ায় এই মধু তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।
এরপর একে একে গরান, কাঁকড়া, পশুর, হরগোজা ও কেওড়া ফুলে মধুর টান শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের ধরন বদলায় এবং সেই অনুযায়ী মধুর স্বাদ ও রঙও বদলে যায়। গরান গাছের ছোট সাদা ফুলগুলো দেখতে সাধারণ হলেও কাছে গেলে এর কোমলতা মুগ্ধ করে। মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত গরানে ফুল ফোটে এবং এই ফুলের মধু হালকা লালচে রঙের হয়। অন্যদিকে কাঁকড়া গাছের লালচে বা গোলাপি ফুলগুলো বেশি নজরে পড়ে। কাঁকড়া ফুল থেকে পাওয়া মধু অন্য মধুর সঙ্গে মিশে সুন্দরবনের হরেক ফুলের মধুকে আরও সমৃদ্ধ করে।
পশুর গাছের ছোট সাদা ফুলগুলো থোকায় থোকায় ফোটে, যা মৃদু সুবাসে ভরপুর। এই ফুলের মধু মিষ্টি হলেও সামান্য কষাভাব থাকে। অন্যদিকে কেওড়া গাছের ফুলের কুঁড়ি দেখতে বেশ চমৎকার। গোলাকার এই কুঁড়িগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেটে গিয়ে সাদা বা হালকা সবুজাভ পাপড়িতে রূপ নেয় এবং ভেতর থেকে লালচে কেশর বেরিয়ে আসে। কেওড়া ফুলের মধু হালকা রঙের, সুগন্ধিযুক্ত ও কিছুটা টক-মিষ্টি স্বাদের হয়।
ফুল, মৌমাছি আর মৌয়াল—এই তিনের মেলবন্ধনে সুন্দরবন যেন এক অপূর্ব ছন্দে টিকে আছে। বসন্তের এই সময়টি তাই শুধু ঋতুর বদল নয়, এটি এক জীবন্ত ছবি, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের জীবন মিলেমিশে এক হয়ে আছে।

Comments
Comments