[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

দস্যু আতঙ্কে অস্থির সুন্দরবন, দেড় বছরে ৬১ গ্রেপ্তারেও স্বস্তি নেই

প্রকাশঃ
অ+ অ-
সুন্দরবন | ফাইল ছবি

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা কমাতে জোরদার অভিযান চালানো হচ্ছে বলে দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে গত দেড় বছরে ৬১ জন দস্যুকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হলেও বননির্ভর জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের মধ্যে আতঙ্ক কমেনি। উল্টো নিরাপত্তাহীনতা এখনো প্রবল বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

২০১৮ সালের নভেম্বরে ৩২টি দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল সরকার। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়লে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক দস্যু চক্র।

স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, বর্তমানে সুন্দরবনের নদী ও খালে অন্তত ১০ থেকে ১২টি দস্যু দল সক্রিয় আছে। তারা নৌকা থামিয়ে জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। দস্যুদের সঙ্গে আগাম সমঝোতা ছাড়া এখন বনে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

কয়রা উপজেলার একাধিক মৌয়াল জানান, দস্যুদের বিভিন্ন দলকে নৌকাপ্রতি মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হচ্ছে। একেকটি নৌকার জন্য কখনো লাখ টাকার বেশিও দিতে হয়। আবার বিভিন্ন দল আলাদাভাবে টাকা দাবি করায় খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব টাকা সরাসরি দস্যুদের হাতে না দিয়ে এলাকার কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিশোধ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বনজীবী বলেন, ‘এলাকায় থাকা দস্যুদের সহযোগীদের নাম বললে আমাদের আর কোনো দিন সুন্দরবনে যাওয়া হবে না। মাছ ধরা ও কাঁকড়া সংগ্রহের জন্যও নৌকাপ্রতি অন্তত চার হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।’

সম্প্রতি দস্যুদের সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। ৭ এপ্রিল সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বনজীবী আতিয়ার গাজী (৬২) সুন্দরবনের কলাগাছিয়া মুল্লিখালে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জানান, চাঁদা না দেওয়ায় ফেরার পথে দস্যুরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

একই ধরনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর গ্রামের হান্নান সরদার। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ ১০–১২ জন অস্ত্রধারী বনদস্যু আমাকে ঘিরে ফেলে। গাছের সঙ্গে বেঁধে পায়ে গুলি করে। পরে হাঁটুর নিচ থেকে পা কেটে ফেলতে হয়েছে।’

শ্যামনগরের হরিনগর গ্রামের জেলে আবু তাহের জানান, তিনি ছয় দিন দস্যুদের হাতে বন্দি ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা মাছ ধরছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন এসে বন্দুক তাক করে নিজেদের ডন বাহিনী পরিচয় দেয়। আমাদের নিয়ে সীমান্তবর্তী রায়মঙ্গল নদের ভেতরে আটকে রাখে। পরে মাথাপিছু ৪০ হাজার টাকা দিয়ে মুক্তি পাই।’

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, সুন্দরবনের ভৌগোলিক জটিলতা ও দুর্গম পরিবেশের কারণে অভিযান চালানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলেও দ্রুত সেখানে পৌঁছানো ও গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন। দস্যুরা জঙ্গলের আড়াল থেকে সহজেই নজরদারি করতে পারলেও নদী-খাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পক্ষে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম ১ এপ্রিল সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মধু আহরণ উদ্বোধনের এক অনুষ্ঠানে বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে দুর্গম সুন্দরবনে অপরাধ দমন করা শহরের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন দস্যু চক্রের ৬১ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৫৯৯টি গুলি উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে ৭৮ জন জেলে ও ৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান চলছে। এর অংশ হিসেবে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ পরিচালিত হচ্ছে। হারবারিয়া, কৈখালী, কয়রা, নলিয়ান, মান্দারবাড়ি ও শ্যামনগরসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

তবে উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, বাস্তবে এখনো সুন্দরবনে দস্যু-আতঙ্ক কমেনি। দস্যুদের ভয়ে অনেক বনজীবী পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু বনের ভেতরে অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দস্যুদের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন