[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

হাম ছড়িয়েছে ৫৬ জেলায়, উদ্বিগ্ন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
হামে আক্রান্ত ২০ মাস বয়সী শিশু মাইশা তুন নূরকে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। শুরুতে জ্বর, সর্দি ও কাশি থাকলেও পরে কাশি বেড়ে যাওয়ায় শিশুটিকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসে পরিবার। গতকাল দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত দুই বছরে শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, হামের বর্তমান বিস্তারের সেটিই প্রধান কারণ। দেশের ৫৬ জেলায় এখন হাম ছড়িয়ে পড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয় এই তথ্য লিখিতভাবে জানিয়েছে। হাম পরিস্থিতি বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা তাদের কাছে থাকা সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে এবং ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মিল রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্য ঠিক করা আছে। এর মানে হলো, অন্তত ১২ মাস দেশে হাম ও রুবেলা ভাইরাসের কোনো সংক্রমণ থাকবে না। এই লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ বেশ ভালো করছিল। প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে হাম সংক্রমণের হার ছিল ২০২২ সালে ১ দশমিক ৪১, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৩ এবং ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৭২। তবে বর্তমানে এই হার বেড়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির এ অবনতি লক্ষ করা যাচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা নির্মূল করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংক্রমণ বেশ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও (প্রতি ১০ লাখে ১–এর নিচে), বর্তমানে তা হঠাৎই বেড়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন হামে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যার মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। রোগটি এখন দেশের ৫৬টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রাঙামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দরবান—এই আট জেলায় এখন পর্যন্ত হাম ধরা পড়েনি।

বর্তমানে দেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে সংক্রমণের হার প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এটি সারা দেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার পরিষ্কার লক্ষণ। বাংলাদেশের এই পরিস্থিতির কথা গত ১৮ মার্চ জেনেভা কার্যালয়কে জানিয়েছে সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয়।

সারা দেশ থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫০ ছাড়িয়েছে।

বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে কাজ করছে।

যদিও সংক্রমণ ৫৬টি জেলায় ছড়িয়েছে। তবে কিছু এলাকা এখন সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে। বেশ কিছু জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি সফল হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এলেও এখন কেন এমন সংক্রমণ দেখা দিল—সে বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল।

সংস্থাটির প্রাথমিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, এই সংক্রমণের প্রধান কারণ হলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতার অভাব। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে কোনো কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৯ শতাংশেরই বয়স দুই বছরের কম। এর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৪ শতাংশ, যা থেকে বোঝা যায় এই বয়সের শিশুরা সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের এই খারাপ পরিস্থিতি এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ থেকে হাম ও রুবেলা দূর করার লক্ষ্য ঠিক করা ছিল। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই সংক্রমণ বেশ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও (প্রতি ১০ লাখে ১-এর নিচে), বর্তমানে তা হঠাৎ অনেক বেড়ে গেছে।
আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৪ শতাংশ, যা এই কনিষ্ঠতম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ সংবেদনশীলতা নির্দেশ করে।
যদিও সংক্রমণ ৫৬টি জেলায় ছড়িয়েছে, তবে কিছু এলাকা এখন সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে। বেশ কিছু জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা এখন সংক্রমণের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ আগে থেকেই টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে উচ্চ হারে টিকা দিয়ে আসছে। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, ১২ মাস বয়সের মধ্যে পূর্ণ টিকা দেওয়ার হার ছিল যথাক্রমে ৮৩ দশমিক ৯ শতাংশ ও ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও করোনা মহামারির সময় উচ্চ হার বজায় রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এর ফলে একটি ডোজও পায়নি বা আংশিক টিকা পেয়েছে—এমন শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়।

এ ছাড়া হামের টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং কম টিকাদানের হার মিলে এমন একদল শিশু তৈরি করেছে যারা সহজেই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই সংখ্যা জন্মহারের সমান বা তার চেয়েও বেশি হয়ে যেতে পারে। ফলে শিশুদের একটি নির্দিষ্ট অংশে রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়। যখন কোনো এলাকায় টিকাদানের হার পর্যাপ্ত থাকে না বা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়, তখনই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।  
 
শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে উপযুক্ত জনবলের ঘাটতি আছে। জনবলঘাটতি দূর করতে হবে, ঠিক মানুষকে ঠিক জায়গায় বসাতে হবে। আর কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে উদ্দেশ্য সফল হবে না।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতার অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। নিয়মিত টিকার ডোজ না দেওয়া, বিভিন্ন এলাকা ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদানের হারের পার্থক্য এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মতো বিষয়গুলো এখানে ভূমিকা রেখেছে।

পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে—এমন প্রশ্নের উত্তরে সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি নির্ভর করবে পদক্ষেপগুলোর গতি ও মানের ওপর, বিশেষ করে হামের সম্পূরক টিকাদান কার্যক্রমের ওপর। যদি রোগী শনাক্ত ও অনুসন্ধানের কাজ জোরদার করা যায় এবং আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত উচ্চ হারে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়, তবে এই বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে যদি রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি থেকে যায়, তবে রোগী বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হাম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ সরকারকে এর মোকাবিলায় কার্যক্রম আরও জোরদার ও দ্রুত করার পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য সারা দেশে দ্রুত উচ্চমানের হাম ও রুবেলা টিকাদান অভিযান পরিচালনা করা; নজরদারি বাড়ানো, দ্রুত তথ্য প্রদান এবং পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত করা; সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ দেওয়াসহ রোগী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া; সঠিক তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়ে সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির দক্ষতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, সংস্থাটি যেসব সুপারিশ করেছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়েও যোগ্য জনবলের অভাব আছে। এই ঘাটতি দূর করতে হবে এবং সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্বে বসাতে হবে। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে না পারলে উদ্দেশ্য সফল হবে না।
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন