দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজের ক্রেতা নেই, লোকসানের শঙ্কায় চাষিরা
![]() |
| পাইকার আসছে না। তাই পরিপুষ্ট তরমুজ নিয়ে বিপাকে চাষি। সোমবার বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
খরা আর লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই পেরিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাঠজুড়ে এখন তরমুজের সমারোহ। সবুজ লতার ভেতর থেকে বড় হয়ে ওঠা তরমুজ যেন চারদিকে হাসিমুখে উঁকি দিচ্ছে। অনুকূল আবহাওয়ায় এ বছর ফলন হয়েছে বাম্পার। তাই ভালো দামের আশায় ছিলেন চাষিরা। কিন্তু হঠাৎ পাইকার না থাকায় সেই আশায় নেমেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। হাসির বদলে এখন উদ্বেগ আর হতাশায় পড়েছেন এ অঞ্চলের তরমুজচাষিরা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের ফসলি জমি লবণাক্ততা, খরা ও অতিবৃষ্টির কারণে গত কয়েক বছর ধরে কৃষিতে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছিল। এই অবস্থায় টিকে থাকতে স্থানীয় কৃষকেরা লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ জমিতে প্রায় এক দশক ধরে তরমুজ চাষ শুরু করেন। প্রতিবছরই তরমুজ চাষের পরিমাণ বাড়ছে। কখনো ভালো আবহাওয়ায় লাভ হচ্ছে, আবার কখনো অসময়ের ঝড়-বৃষ্টিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এবার খরা থাকলেও অসময়ের ঝড়-বৃষ্টি না হওয়ায় ফলন হয়েছে বাম্পার। কিন্তু পাইকার না থাকায় তরমুজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। এতে লোকসানের আশঙ্কায় হতাশা বেড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চর এলাকায় এবার ব্যাপক তরমুজ চাষ হয়েছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা কমে গেছে।
চলতি বছর বরিশাল বিভাগে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৫৫ টন ধরে মোট ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ টন তরমুজ উৎপাদন হবে বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন।
![]() |
| পেকে গেছে তরমুজ। কিন্তু ক্রেতাসংকটে কৃষকেরা তা তুলছেন না। সোমবার বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তরমুজ আবাদ হয়েছে পটুয়াখালী জেলায়—৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে। এরপর ভোলায় ১৯ হাজার ৭৫৩ হেক্টর, বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর, বরিশালে দুই হাজার ৭০৫ হেক্টর, পিরোজপুরে ৩৯৬ হেক্টর এবং ঝালকাঠিতে ১২৭ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।
বরগুনার আমতলী উপজেলায় এ বছর ৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু চাষিরা তা ছাড়িয়ে ৪ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে তরমুজের বীজ রোপণ করেছেন। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার ফলন হয়েছে বাম্পার। উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে প্রায় ২৭০ কোটি টাকার আয়ের আশা করা হয়েছিল। তবে মৌসুম শুরুতেই বড় ক্রেতার অভাবে বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।
আমতলীর বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা বলেন, প্রতিবছর বড় ব্যবসায়ীরা আমতলীর তরমুজ কিনে নাটোর, দিনাজপুর, ঢাকাসহ দেশের নানা অঞ্চলে পাঠাতেন। কিন্তু এবার উত্তরাঞ্চলে চাহিদা কম থাকায় বড় ব্যবসায়ীরা তরমুজ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
গত সোমবার আমতলীর হলদিয়া, চাওড়া, আঠারোগাছিয়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের খেত ঘুরে দেখা যায়, অনেক তরমুজ পেকে গেছে। তবু ক্রেতার অভাবে কৃষকরা তা তুলছেন না। কোথাও কোথাও তরমুজ কেটে খেতেই ফেলে রাখা হয়েছে।
হলদিয়ার চাষি আল আমিন জানান, তিন হেক্টর জমিতে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগ করে তরমুজ চাষ করেছেন। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। এভাবে চললে তার বিনিয়োগও উঠবে না বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা গ্রামের চাষি মামুন মোল্লা বলেন, গত কয়েক বছর দেশের বড় ব্যবসায়ীরা এখানে এসে খেত থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যেতেন। এবার তারা আসছেন না, ফলে স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, এ বছর তরমুজের উৎপাদন ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারদর কম থাকায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না। পরিস্থিতি যদি এমন থাকে, উপজেলা চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। তাই তাঁরা বড় ব্যবসায়ীদের তরমুজ কিনতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করছেন।
শুধু আমতলী নয়, পটুয়াখালীর অন্যান্য উপজেলাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। এতে স্থানীয় চাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের চরচান্দুপাড়া গ্রামের কৃষক ফেরদৌস তালুকদার জানান, চলতি বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত তার খরচ প্রায় ২১ লাখ টাকা। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও বাজারে সঠিক দাম না পাওয়াায় তিনি বিপাকে পড়েছেন।
ফেরদৌস তালুকদার বলেন, গত বছর যেখানে দুই গাড়ি তরমুজ প্রায় ৯ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, এবার সেই তুলনায় ২ লাখ টাকাও পাচ্ছেন না। ২ হাজার ২০০ টাকার মণদরের তরমুজ ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাইকার না আসা এবং মোকামে চাহিদা কমে যাওয়ায় তিনি অন্তত ১২ লাখ টাকার লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
কলাপাড়া কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, এ বছর কলাপাড়ায় প্রায় তিন হাজার চাষি ৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের বীজ রোপণ করেছেন। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্ধেক চাষি লোকসানে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগের অন্যান্য জেলাগুলোতেও একই পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় জমি পানির নিচে থাকায় এবং নদীর জোয়ার-ভাটার কারণে পলিমাটি জমে উর্বরতা বেড়ে যায়। ফলে তুলনামূলক কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।
দেশে কৃষিপণ্য বিপণনের দায়িত্বে আছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। জানতে চাইলে বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম মাহবুব আলম প্রথম আলোককে বলেন, এবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চর এলাকায় ব্যাপক তরমুজ চাষ হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা অনেকটা কমেছে। তবে এখন মৌসুম কেবল শুরু হয়েছে। যারা আগাম তরমুজ উৎপাদন করেছেন, তাদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে। কিন্তু দিন যত যাবে, তরমুজের চাহিদা তত বাড়বে।


Comments
Comments