মেয়াদ শেষ হচ্ছে, কার্যকারিতা হারাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের ২০ অধ্যাদেশ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই দুটিসহ মোট চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করতে সংসদে বিল আনার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি।
এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে করা অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধে করা অধ্যাদেশ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এই মুহূর্তে বিল হিসেবে পেশ না করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তীতে যাচাই-বাছাই করে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার কথা বলা হয়েছে। এটি হলে এই অধ্যাদেশগুলো বাতিল বলে গণ্য হবে। ১০ এপ্রিলের পর এগুলো আর কার্যকর থাকবে না। সব মিলিয়ে মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
বাকি ১১৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের আইনি সুরক্ষা দিয়ে করা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশসহ ৯৮টি অনুমোদনের জন্য একইভাবে বিল হিসেবে সংসদে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। আর সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ ও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৫টি সংশোধিত আকারে বিল হিসেবে পেশ করার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে বৃহস্পতিবার এসব সুপারিশসহ সংসদে প্রতিবেদন দেয় জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। সন্ধ্যায় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন সংসদে প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটিতে থাকা জামায়াতে ইসলামীর তিন সংসদ সদস্য ভিন্নমত দিয়েছেন। প্রতিবেদনে তাঁদের এই ভিন্নমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম বৈঠকে ১২ মার্চ অধ্যাদেশগুলো পেশ করা হয়। পরে এগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। আগামী সোমবার অধ্যাদেশগুলো বিল হিসেবে পেশ করার কার্যক্রম শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুপারিশ অনুযায়ী যে ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে যাচ্ছে, তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। সব মিলিয়ে সংস্কারের বিষয়ে আগামী দিনে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হতে পারে।
চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের জন্য বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬।
সংবিধানে বিচারক নিয়োগের জন্য আইন করার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় তা করা হয়নি। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে। সেখানে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম বিচার বিভাগীয় নিয়োগ পরিষদ’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আলাদা এই পরিষদ যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
অন্যদিকে নিম্ন আদালতের দেখভাল, নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য একটি আলাদা সচিবালয় তৈরির লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ করা হয়। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় তৈরি হলে নিম্ন আদালত ও প্রশাসনিক আদালতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সব প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করবে এই সচিবালয়।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বিচারকাজে নিয়োজিত বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও ছুটিসহ অন্যান্য সব সিদ্ধান্ত এই সচিবালয়ের হাতে থাকবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রধান বিচারপতির ওপর এবং সচিবালয়ের সচিব হবেন এর প্রশাসনিক প্রধান।
এই দুটি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়া বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা। তাঁরা তাঁদের ভিন্নমতে বলেছেন, এই দুটি অধ্যাদেশ বিচার বিভাগকে আরও শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ করতে এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।১৬টি অধ্যাদেশের বিষয়ে এখনই বিল হিসেবে পেশ না করে পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সালের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশ।

Comments
Comments