উপাচার্য নিয়োগে সেই পুরোনো ধারা, এবারও গুরুত্ব পেলেন 'দলীয় অনুগত' শিক্ষকরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষা তদারকি সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন উপাচার্য ও ইউজিসির চেয়ারম্যান হিসেবে যাঁদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাঁদের নাম ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক। এখন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুতই এ বিষয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন উপস্থিত ছিলেন।
বিএনপি সরকার সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, তাঁদের একজন সরাসরি দলীয় পদে রয়েছেন। বাকি ছয়জন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠনের বর্তমান ও সাবেক নেতা। আগেকার সময়েও একইভাবে দলীয় অনুগত শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পদ পাওয়ার আশায় শিক্ষক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই ব্যবস্থায় পরিবর্তনের আশা করা হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি।
অথচ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ এবং ‘সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার’ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হচ্ছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের মূল নিয়ম অনুযায়ী, সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের তালিকা থেকে একজনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম ঠিকমতো মানা হয় না। বিদায়ী উপাচার্য নিয়াজ আহমদ খান প্রায় দেড় বছরেও সিনেট নির্বাচন দেননি। ফলে নতুন উপাচার্যও সিনেটের নির্বাচিত তালিকা ছাড়াই নিয়োগ পাচ্ছেন।
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হচ্ছেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান। তিনি জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম উপাচার্য হিসেবে মোহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার নিয়োগ পেয়েছিলেন।
২০২৫ সালের মে মাসে দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সুপারিশের জন্য একটি ‘অনুসন্ধান কমিটি’ গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সুপারিশে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই নিয়ম মানা হয়নি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রইস উদ্দিন। তিনি বর্তমানে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এখানে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক রেজাউল করিম।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এই অধ্যাপক বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্যের দায়িত্ব পাচ্ছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে কুয়েটের উপাচার্য করা হয়েছিল। তবে আন্দোলনের মুখে পরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এখন তিনি আবারও উপাচার্য হচ্ছেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম খানকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিন আগে সাত কলেজ নিয়ে গঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এ এস মো. আবদুল হাছিবকে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাঁকে সরে যেতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উপাচার্য নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক সোমবার বলেন, ‘একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ?’ শিক্ষাগত যোগ্যতাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সর্বোচ্চ দক্ষতা ও কাজের মান দেখে বিশ্ববিদ্যালয় অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সোমবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই দিনে ইউজিসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুন আহমেদকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও ছিলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, উপাচার্য নিয়োগে আওয়ামী লীগ আমলে দলীয় আনুগত্যই ছিল প্রধান শর্ত। এভাবে উপাচার্য নিয়োগ হলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় দলের আধিপত্যই প্রাধান্য পায়, শিক্ষা গৌণ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও একই চিত্র দেখা গেছে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচিত। তারা অতীত থেকে শিক্ষা নেবে, নিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবে এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম তৈরি করবে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু যেভাবে নিয়োগ হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে তারা অতীতের ধারা রক্ষা করতেই বেশি আগ্রহী। এমন হতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের যে অবনতি দেখা যাচ্ছে, তা থেকে বের হওয়ার পথ পাওয়া যাবে না। এটি একটি খারাপ লক্ষণ।

Comments
Comments