চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি চালানো অস্ত্রধারীরা অধরা, জনমনে উদ্বেগ
![]() |
| স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে তিন সন্ত্রাসী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরায় | ছবি: ভিডিও থেকে |
চট্টগ্রাম নগরে প্রকাশ্যে গুলি করা অস্ত্রধারীদের এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চালালেও গত ছয় দিনে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এতে নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের তথ্যদাতা বা গুপ্তচর ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়া এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও কৌশলে অপরাধীরা এগিয়ে থাকায় তাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানা-পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ শাখাগুলোও অপরাধীদের নজরদারিতে রাখে। এ জন্য তথ্যদাতার জাল আরও শক্তিশালী করতে হবে। অপরাধীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রযুক্তি ও তথ্যদাতার মাধ্যমে শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা সহজ হবে।
নজরদারি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সন্ত্রাসী দুই হাতে দুটি পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ছে। বাকি তিনজনের মধ্যে একজনের হাতে ছিল স্বয়ংক্রিয় ছোট মেশিনগান, একজনের কাছে চীনা রাইফেল এবং অন্যজনের কাছে ছিল শটগান। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, এক কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যেই এই গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ে পুলিশের সোর্স দুর্বল হয়ে পড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৌশলে সন্ত্রাসীদের এগিয়ে থাকায় তাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।
ঘটনার সাত দিন পার হলেও গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কোনো অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের দাবি, অপরাধীরা পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে গেছে। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো নগরের কোথাও লুকিয়ে রাখা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অস্ত্র বা অপরাধীদের অবস্থান এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় হতাশ স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। জানি না আবার কখন কী ঘটে যায়।’
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, অস্ত্রধারী অপরাধীদের ধরতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। নিয়মিত বিশেষ অভিযান চলছে। নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তবে পুলিশের চলমান বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য আসেনি। জুয়াড়ি, কিশোর অপরাধী চক্রের সদস্য ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হলেও গুলি চালানো অস্ত্রধারীদের কাউকেই ধরা যায়নি। গত রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচ দিনের অভিযানে ২৫১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইসতিয়াক ২০২৩ সালে চালিতাতলীতে আমার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর মামলার আসামি। তিনি কীভাবে আমার সহযোগী হন?
বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী
অভিযানের মধ্যে গত সোমবার রাতে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী এলাকা থেকে ইসতিয়াক হাসান ও মো. জসিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার দুজন বিদেশে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী।
তবে পুলিশের এই দাবি অস্বীকার করেছেন সাজ্জাদ। তিনি ফোনে বলেন, ‘ইসতিয়াক ২০২৩ সালে চালিতাতলীতে আমার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার মামলার আসামি। তিনি কীভাবে আমার সহযোগী হন?’
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি চালিতাতলী এলাকায় সাজ্জাদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তদন্ত শেষে নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আরিফুর রহমান ইসতিয়াক হাসানসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। বর্তমানে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
এর আগে গত বছরের ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর গণসংযোগ চলাকালে গুলি করে সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা নামের একজনকে হত্যা করা হয়। নিহত সরোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা ছিল। নেতা-কর্মীদের ভিড়ের মধ্যে খুব কাছ থেকে গুলি করে তাঁকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় প্রশিক্ষিত কোনো বন্দুকধারী জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। তবে বাঁ হাতে গুলি চালানো সেই ব্যক্তি কে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
নিহত সরোয়ারের ভাই আজিজ উদ্দিন বলেন, ‘চার মাস পার হলেও বাঁ হাতে গুলি করা সেই অস্ত্রধারীকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। উল্টো বড় সাজ্জাদ আমাদের হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে।’

Comments
Comments