ঢাকার ফুটপাতে দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজি চলছেই, বদলায়নি চিত্র
![]() |
| ঢাকার গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার হয়ে স্টেডিয়াম মার্কেট যাওয়ার এই সড়কের প্রায় পুরোটাজুড়েই দোকান নিয়ে বসেছেন হকাররা | ফাইল ছবি |
গত দুই বছরে তিনটি ভিন্ন ধরনের সরকার দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। এর মধ্যে দুটি ছিল নির্বাচিত এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন। প্রতিটি সরকারের আমলেই ঢাকার মানুষ একটি সাধারণ সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে—চাঁদাবাজ চক্রের মদদে হকারদের ফুটপাত দখল। এই ভোগান্তি এখনো আগের মতোই চলছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার প্রধান সড়কের পাশে বসা অন্তত এক ডজন হকার জানান, তাঁরা প্রতিদিন বা মাসিক ভিত্তিতে টাকা দিয়ে ব্যবসা চালান। এই টাকা চলে যায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পকেটে। হকারদের দাবি, এই চক্রটিই ঢাকার অবৈধ ফুটপাত ব্যবসার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে।
দুই দশক ধরে গুলিস্তানের ফুটপাতে ব্যবসা করা এক হকার বলেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক—তারেক রহমান, শেখ হাসিনা কিংবা ইউনূস—চাঁদাবাজ চক্র ঠিকই প্রতিটি প্রশাসনে নিজেদের লোক খুঁজে নেয়। ফলে তাদের অবৈধ ব্যবসা কখনোই বন্ধ হয় না।
ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটছেন, যা তাঁদের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি যানজট পরিস্থিতিও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে না পারায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কের ওপর এই অস্থায়ী বাজারের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও অনেক বেশি। কারণ, অধিকাংশ দোকান প্লাস্টিক, কাপড় ও অন্যান্য দ্রুত আগুন ধরে যায় এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি। অনেক দোকানে আবার বিপজ্জনকভাবে বৈদ্যুতিক সংযোগও নেওয়া হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার হকার সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। রাজধানীতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন, তাই পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে গেলে পুরো এলাকার স্বাভাবিক কার্যক্রম থমকে যায়। তাঁদের পরামর্শ, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ করা হলে একদিকে তাঁদের জীবিকা বাঁচবে, অন্যদিকে যান চলাচলও স্বাভাবিক হবে।
মিরপুর, ফার্মগেট, নিউমার্কেট ও মালিবাগ-মৌচাক এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অস্থায়ী দোকানপাট ফুটপাত ও সড়কের একাংশ দখল করে রাখে। এখানে কাপড়, জুতা, প্রসাধনী ও নিত্যপণ্য বিক্রি হয়। বিশেষ করে রমজান মাসে অফিস ছুটির পর যখন মানুষ বাড়ি ফেরেন, তখন এই সমস্যা চরম আকার ধারণ করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকে রাস্তায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে সমঝোতা করেই হকাররা তাঁদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মিরপুরের বেশ কিছু ব্যস্ত সড়ক এখন অস্থায়ী বাজারে রূপ নিয়েছে। এসব বড় বড় বাজার রাস্তা দখল করে রাখায় সেখানে জুতা, কাপড় ও ব্যাগ থেকে শুরু করে মোবাইলের সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক পণ্যও বিক্রি হচ্ছে। মিরপুর এলাকায় ফুটপাত দখলের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানান, জাতীয় নির্বাচনের পর কিছু সময় চাঁদাবাজি বন্ধ ছিল। তবে রমজান শুরু হওয়ার পর থেকে তাঁদের আবারও নিয়মিত টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
মিরপুরের ১, ২, ১০, ১১, ১২ এবং ১৩ নম্বর এলাকার ফুটপাতে ব্যবসা করা বেশ কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। কেউ এ জন্য ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের দায়ী করেছেন, আবার কেউ স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুসারীদের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁদের মতে, আগে যারা টাকা তুলত তারা এখন নেই, এখন নতুন কিছু লোক এই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ী পুলিশের কিছু সদস্যের জড়িত থাকার কথাও জানিয়েছেন।
মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার হোপ গলির এক ব্যবসায়ী বলেন, চাঁদাবাজি কোনো না কোনোভাবে চলছেই। কেউ বিদ্যুৎ বিলের নামে টাকা নেয়, কেউ নেয় সমিতির নামে। যেহেতু ফুটপাতে ব্যবসা করা অবৈধ, তাই আমরা বাধ্য হয়েই টাকা দিই।
ফার্মগেটের ফুটপাতের দুই পাশেই দোকানের সারি দেখা গেছে। এখানে বেশির ভাগ দোকানে সবজি, ফল, শিশুদের পোশাক ও প্রসাধনী বিক্রি হয়। অনেক হকার আবার তাঁদের ভ্যান রাস্তার ওপরই রাখেন। ফলে পথচারীদের হাঁটার জায়গা একদমই থাকে না। দুই মিনিটের পথ হাঁটতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ মিনিট।
ফার্মগেটের এক হকারের কাছ থেকে ফল কেনার সময় আলামিন নামে এক ব্যক্তি একটি সড়ক দুর্ঘটনা দেখেন। ভিড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় একটি রিকশা উল্টে যায় এবং যাত্রী রাস্তায় পড়ে যান। ওই রিকশায় থাকা এক বছরের একটি শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কেন রাস্তায় দোকান বসান—এমন প্রশ্নে এক সবজি বিক্রেতা জানান, ব্যবসা করার জন্য তাঁদের কাছে বিকল্প কোনো জায়গা নেই। তিনি আরও জানান, সেখানে বসার অনুমতি পেতে তাঁদের টাকা দিতে হয়। তবে কার কাছে কত টাকা দিতে হয়, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। তাঁর মতে, এই টাকা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে যায়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তাঁরা কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন বলে জানান ওই ব্যবসায়ী।
ফার্মগেট থেকে পান্থপথ সংকেত পর্যন্ত ফুটপাতের দুই পাশে খাবারের দোকান বসানো হয়েছে। রমজান মাস হওয়ায় দিনের বেলা অনেক দোকান পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে, ফলে পুরো ফুটপাত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। একই এলাকায় সড়কের একটি অংশ রিকশা গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ফুটপাত ও সড়ক উভয়ই পথচারীদের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পর্দাঘেরা জায়গাগুলোতে রাতে মাঝেমধ্যে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। রিকশাচালক আরমানের কথাতেও এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেল। তিনি বলেন, রাত গভীর হলে মানুষ এখানে জড়ো হয়ে মাদক সেবন করে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সমর্থনে এসব চলে বলে কেউ তাদের থামাতে সাহস পায় না।
এই এলাকায় রিকশা গ্যারেজ বসানো আসলাম উদ্দিন টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। গ্যারেজ চালানোর জন্য তাঁকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিতে হয়। তবে এই টাকা তিনি কাকে দেন, তা স্পষ্ট করেননি।
পান্থপথ সংকেত থেকে আসবাবপত্রের দোকানের গলি হয়ে কাঁঠালবাগান পর্যন্ত সরু সড়কে সব সময় ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনকি এইটুকু রাস্তার পাশেও প্রচুর দোকানপাট রয়েছে। রমজান মাসে বিক্রেতারা ফুটপাতে ইফতারি বিক্রি করেন। সড়কের দুই পাশে মালপত্র ও ভ্যান থাকায় রিকশা চলাচলের সময় পুরো রাস্তা আটকে যায়। এতে পথচারীদের চলাচল করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। তবে ওই এলাকার আসবাবপত্রের দোকানের মালিকরা জানান, তাঁরা সব সময় মালপত্র সড়কে রাখেন না এবং প্রয়োজনে সরিয়ে নেন।
একই অবস্থা নিউমার্কেট এলাকাতেও। নিউমার্কেট থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত ফুটপাত এবং সড়কের কিছু অংশ অসংখ্য দোকানপাটে দখল হয়ে আছে। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুটপাতে প্রায় কোনো খালি জায়গা থাকে না। দুপুর ও সন্ধ্যার দিকে ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজটও তীব্র হয়।
আলিফা নামে এক পথচারী জানান, ইফতারে সময়মতো বাড়ি পৌঁছানোর জন্য তিনি অফিস থেকে আগেভাগে বেরিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যানজটের কারণে আমি সায়েন্স ল্যাবরেটরিতেই নেমে পড়ি। নিউমার্কেটের দিকে হাঁটার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ভিড় এতটাই বেশি ছিল যে হাঁটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কর্তৃপক্ষের অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ঈদ উপলক্ষে মালিবাগ-মৌচাক এলাকায় কেনাকাটা বাড়ছে। তবে ফুটপাত ও সড়কের বড় অংশ দখল করা অস্থায়ী দোকানগুলোর কারণে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। মৌচাক মার্কেট থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত ফুটপাত এবং সড়কের দুই পাশেই দোকানের সারি দেখা যায়। বিক্রেতারা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, শিশুদের পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, গয়না, ব্যাগ ও খেলনা বিক্রি করছেন। পথচারী দবির হোসেন বলেন, ফুটপাতে চলার কোনো উপায় নেই, বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর দিয়েই চলতে হচ্ছে।
আমিন নামে আরেক পথচারী বলেন, ফুটপাত এখন যেন হকারদের হয়ে গেছে, পথচারীদের নয়। আমাদের হাঁটার জন্য নিরাপদ কোনো জায়গা নেই।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, হকাররা অবৈধভাবে সড়ক দখল করছে। তাদের শনাক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা উচিত। একই সঙ্গে এই কাজের পেছনের মূল চক্রটিকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা মহানগর পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনগুলোর দায়িত্ব।
ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা আগের দেওয়া বক্তব্যগুলোই পুনরায় জানিয়েছেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম বলেন, যদি কোনো বিএনপি নেতা বা অন্য কেউ চাঁদাবাজি করে, তবে প্রমাণের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, পুলিশ হকারদের কাছ থেকে টাকা নেয় না। যদি চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাই, তবে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চাঁদাবাজরা টাকা তোলার জন্য পুলিশের নাম ব্যবহার করতে পারে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। তবে ঈদের আগে ক্রেতাদের ভিড় এবং মৌসুমি বিক্রেতাদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

Comments
Comments