[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

উত্তরাঞ্চলের পথে পথে ভোগান্তি, বিপর্যস্ত দুই ট্রেনের সময়সূচি

প্রকাশঃ
অ+ অ-
যানজটে পথের দুই পাশে সকাল ৯টার দিকে আটকে আছে সারি সারি যানবাহন। এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল, ১৯ মার্চ ২০২৬ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

পবিত্র ঈদুল ফিতর আগামীকাল শনিবার। ঈদকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে অনেকে ঢাকাকে ছেড়েছেন। শেষ মুহূর্তেও মানুষ গ্রামে যাওয়ার জন্য সড়ক, রেল ও নৌপথ ব্যবহার করছেন। বৃহস্পতিবার এই তিন পথেই যাত্রীদের ভোগান্তি দেখা গেছে। কিছু সড়কে দীর্ঘ যানজট ছিল, আর বিভিন্ন রুটে ঘরমুখী মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়েছিল উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের। যমুনা সেতুতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও সেতুর ওপর ১৫টি গাড়ি বিকল হওয়ায় ভোরে সেতুর পূর্ব প্রান্তে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অন্তত ২৫ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয় হাজারো যাত্রীকে। তবে বিকেলের দিকে যানজট কমে আসে।

রেলপথেও ঈদযাত্রা স্বস্তিকর ছিল না। একতা এক্সপ্রেস ও নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি যথাক্রমে সাত ঘণ্টা ও পাঁচ ঘণ্টা দেরিতে কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। যাত্রীরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বেঞ্চে বসে আবার কেউ ব্যাগপত্রে ভর দিয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করেন।

পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সকাল থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ভিড় ছিল। বিকেলের দিকে ভিড় আরও বেড়ে যায়।

ঈদকে ঘিরে জনসমাগমস্থল, ঈদগাহ, বাস-রেল-লঞ্চ টার্মিনালসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশ ও র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। তবুও সড়কে মানুষের ভোগান্তি কমেনি।

এছাড়া কিছু অপরাধের ঘটনা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর উত্তরায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত অটোরিকশা থেকে পড়ে মুক্তা আক্তার নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু ঘটে। খুলনায় একই দিনে এক পরিবারের চার সদস্যকে লক্ষ্য করে গুলি করার ঘটনা ঘটে।

যমুনা সেতুতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও সেতুর ওপর ১৫টি গাড়ি বিকল হওয়ায় ভোরে সেতুর পূর্ব প্রান্তে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অন্তত ২৫ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। পরে বেলা ১১টা ৪০ মিনিট থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত সেতু একমুখী করে দুই লেন দিয়ে যানবাহন উত্তরবঙ্গের দিকে পার করানো হয়। এতে বিকেলে যানজট অনেকটা কমে আসে। যদিও উত্তরবঙ্গগামী লেনে যানজট থাকলেও ঢাকামুখী লেন পুরোপুরি ফাঁকা ছিল।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের চন্দ্রা এলাকা । সকাল সাড়ে নয়টা। ১৯ মার্চ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

 গতকাল বুধবার রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড়, চক্রবর্তী এলাকা হয়ে নবীনগর সড়ক এবং চন্দ্রা-কোনাবাড়ী অংশে দীর্ঘ যানজট দেখা দিয়েছিল। বিকেলে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যানবাহনের গতি কমে যায়। এতে একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। কোথাও কোথাও যানবাহন ধীরগতিতে বা থেমে থেমে চলায় যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীদের দুর্ভোগ বেশি ছিল।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। অনেকেই সময়মতো বাস না পেয়ে ট্রাক বা পিকআপে ঝুঁকি নিয়ে রওনা হন। অনেকে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও করেন। তবে বিকেলের দিকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। যানবাহনের চাপ কমার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট দ্রুত কমে আসে।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পৌলী সেতু এলাকায় রাজশাহীগামী বাসের চালক শহিদুল ইসলাম জানান, ভোর পাঁচটায় ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় টাঙ্গাইল পৌঁছেছেন। সাভার ও চন্দ্রা এলাকায় দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। এরপর আর কোথাও থেমে থাকতে হয়নি, তবে খুব ধীরগতিতে চলতে হয়েছে।

দিনভর এই ভোগান্তি পোহাতে হয় লাখ লাখ মানুষকে, যারা ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক হয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তবে বিকেলের পর যাত্রীদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার পূর্ব পেন্নাই থেকে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড হয়ে উপজেলার ইছাপুর পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এলাকায় গতকাল সকাল থেকে যানজট ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার কারণে ঘরমুখী যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, মহাসড়কের পেন্নাই অংশে দুই লেনের মধ্যে এক লেনে সংস্কার কাজ শুরু হওয়ায় এই যানজটের সৃষ্টি হয়।

যমুনা সেতুর পশ্চিম পারে টোলপ্লাজার সবগুলো বুথ বন্ধ করে দেওয়ায় মহাসড়কে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। যমুনা সেতু পশ্চিম টোল প্লাজা, সয়দাবাদ, সিরাজগঞ্জ। ১৯ মার্চ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

 মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ঈদযাত্রায় দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরমুখী মানুষের চাপ বেড়েছে। ঢাকা, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দূরপাল্লার বাসে নৌপথ পারাপারের জন্য ঘাটে আসা যাত্রীরা এবার তুলনামূলকভাবে কম ভোগান্তিতে পড়ছেন। ঘাটে পৌঁছানোর আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীবাহী বাসগুলো ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে।

ট্রেনপথেও যাত্রীরা স্বস্তিকর ছিলেন না। নীলফামারীর চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস সকালে ৬টা ৪০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছাড়ার কথা থাকলেও ট্রেনটি শেষ পর্যন্ত বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে যায়। এতে ট্রেনে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ট্রেনের ছাদেও যাত্রীরা উঠেছিলেন।

পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেসও কমলাপুর থেকে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও সাত ঘণ্টা দেরিতে বিকেলে রওনা দেয়। এই সময়সূচির বিপর্যয়ের কারণে ঘরমুখী হাজারো মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন বাইরে–ভেতরে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

 এই শিডিউল বিপর্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ। দুপুরে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে তিনি জানান, গত বুধবার ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া নীলসাগর এক্সপ্রেসের ৯টি কোচ বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হওয়ায় এই শিডিউল বিপর্যয় ঘটেছে।

শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রীরা ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। পাশাপাশি কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীদের ভিড়ও বেশি ছিল। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে কেউ বিলম্বিত ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কেউ নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসে প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নেন, যাতে ট্রেন মিস না হয়।

রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে ছেড়ে যাওয়া বরিশাল, খুলনা, সিলেট, পিরোজপুর, কুমিল্লাসহ কয়েকটি রুটের বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। যাত্রীরা বলছেন, ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি চাওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকার পরিবহন কাউন্টার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকেই যাত্রীরা বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ভিড় করছেন। পরিবহনের কর্মীরা রুট অনুযায়ী যাত্রীদের ডাকছেন। যাত্রীরা টিকিটের দাম জানতে চাইছেন। কেউ সঙ্গে সঙ্গে টিকিট কিনছেন, আবার কেউ অন্য কাউন্টার থেকে কম ভাড়া খুঁজছেন।

ঢাকা থেকে বরিশালগামী যমুনা লাইন পরিবহনের যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, ৫০০-৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে পরিবহন কাউন্টার কর্মী ইউসুফ বলেন, ‘আজকে আমাদের বরিশালের বাস নেই। কুয়াকাটার বাসে বরিশালের যাত্রীরা যাচ্ছেন। এ জন্য কুয়াকাটার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।’

খুলনাগামী তৌফিকুল-মিমুন পরিবহনের বাসের একটি জানালা দিয়ে একজন যাত্রী জানান, ‘৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা রাখা হয়েছে। তারপরও সিট পাওয়া যাচ্ছে না।’

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে মৌলভীবাজারগামী রিয়াদ ক্ল্যাসিক বাসের একজন নারী যাত্রী বলেন, তার কাছ থেকে কুলাউড়ার ভাড়া নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ১০০ টাকা। অন্য সময়ে একই ভাড়া ৭০০ টাকা।

পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে লঞ্চে উঠছেন মানুষ। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জে বাসসংকটের কারণে ঘরমুখী যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সকালের দিকে শত শত যাত্রীকে পরিবহন কাউন্টারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেকের টিকিটই পাওয়া যাচ্ছিল না। আবার অনেক কাউন্টারে নির্ধারিত সময়ের গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না।

ঈদে বাড়ি ফিরতে পরিবহন কাউন্টারগুলোতে‌ যাত্রীদের অপেক্ষা। বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ সাইনবোর্ড এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

সকালের পর থেকে লোকাল লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলো ভৈরবসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার রুটে চলাচল শুরু করে। এসব বাসের অধিকাংশ ফিটনেসবিহীন এবং মহাসড়কে চলার উপযোগী নয়। তবু ঈদের সময়ে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও বেশি মুনাফার আশায় ঝুঁকি নিয়ে দূরযাত্রায় নামানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ-মেঘনাঘাট রুটে চলাচলকারী বোরাক পরিবহনের বাসগুলোকে ভৈরব রুটে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। এই পরিবহনের একটি বাসের চালক সাব্বির মিয়া বলেন, ঈদ উপলক্ষে যানবাহনের সংকট ও যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা ভৈরব রুটে যাত্রী পরিবহন করছেন। ভৈরবগামী যাত্রীদের কাছ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই রুটের ভাড়া প্রায় ১০০ টাকা।

আজ সকাল সোয়া ৯টা পর্যন্ত সাইনবোর্ড এলাকার কাউন্টার থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী তিশা পরিবহনের তিনটি বাস ছেড়ে যায়। অনেক যাত্রী বাসের জন্য কাউন্টারে অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিল না। কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা শাহাদাত হোসেন জানান, তিনটি গাড়ি ছেড়ে গেলেও একটি সিটও পাওয়া যায়নি। ঈদ উপলক্ষে ৫০ টাকা বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।

বাসের সংকট ও যাত্রীদের ভোগান্তির সুযোগে নারায়ণগঞ্জে অনেক পরিবহন যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। সাধারণত যাত্রীপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন