[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

নির্বাচনে সহিংসতা বাড়ছে, নারী প্রার্থী না দেওয়া লজ্জাজনক: টিআইবি

প্রকাশঃ
অ+ অ-
রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

নির্বাচনের শুরুর দিকে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও বিভিন্ন দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, কোন্দল এবং সহিংসতা ক্রমে বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন। ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সবাই নিয়ম মেনে চললে দুটি ভোটই ভালোভাবে সম্পন্ন হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। তাঁরা চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক। পরে সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন ইফতেখারুজ্জামান এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এবারের নির্বাচনে অন্তত ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো দলই তা করেনি। এ প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘একজন নারীকেও মনোনয়ন না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জামায়াত মনোনয়ন দেবে বলে আমরা আশাও করিনি। কিন্তু যাদের কাছ থেকে আশা করেছিলাম, তারা কী করেছে? সক্রিয় সবচেয়ে বড় দলের প্রার্থীদের মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। কেন?’ এ সময় নারী প্রার্থী মনোনয়নে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ইফতেখারুজ্জামান অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি, পুরুষতন্ত্র ও সংখ্যাগুরুদের আধিপত্য—এই পাঁচটি বিষয়কে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংখ্যালঘু ও নারীসহ সব ভোটারের নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর। তবে মূল দায় রাজনৈতিক দলগুলোর।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি চলছে। এই সরকারে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সংস্কারের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা ভবিষ্যতের জন্য খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারেনি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে শনিবার রাতে ‘বাংলাদেশ টাইমস’ নামের একটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় থেকে সাংবাদিকদের তুলে নেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানান ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের কার্যালয় থেকে তুলে নেওয়া মেনে নেওয়া যায় না। যে যুক্তিতেই এটি করা হোক, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া এভাবে সাংবাদিকদের তুলে নেওয়া মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য মধ্যযুগীয় বর্বরতার দৃষ্টান্ত। কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার আইনি পদ্ধতি আছে। সাংবাদিকদের পরে ছেড়ে দেওয়া হলেও এর মাধ্যমে পুরো গণমাধ্যমের ওপর ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির বার্তা দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীসহ যেকোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কাজ থেকে দূরে থাকবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’

নির্বাচন নিয়ে সাত পর্যবেক্ষণ

টিআইবির প্রাক্-নির্বাচনী সার্বিক পর্যবেক্ষণে সাতটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো:

১. শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরোনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।  

২. নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে।

৩. আগের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

৪. অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়।

৫. অনলাইন–অফলাইন প্রচারণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও কমিশন তার অনেকটা অপারগতার কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে বা অগ্রাহ্য করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র এবং সব শ্রেণির ভোটারদের জন্য অপরিহার্য সুস্থ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যাপক ঘাটতির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।  

৬. নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যর্থতা, অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়।

৭. নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ ক্রমাগত দৃশ্যমান হচ্ছে।

গণভোট নিয়ে ১১ পর্যবেক্ষণ
গণভোটের প্রচারণা সম্পর্কে টিআইবির পর্যবেক্ষণে ১১টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো:

১. প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমানতা ও উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিপ্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা শুরুতেই গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

২. একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট এবং সংসদে উচ্চকক্ষবিষয়ক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত যদি ওই সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় বিবেচনা করা হয়েও থাকে, তবু বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে৷  

৩. অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ধরনের গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।

৪. সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা (হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচারকে আইনসম্মত নয় বলা) নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল, তা কতটুকু সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক, এসব প্রশ্নের কারণে আরও অধিকতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

৫. নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় নির্বাচন ও গণভোট সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ২(৭) ধারা অনুযায়ী ‘নির্বাচন অর্থ এ আদেশের অধীন কোনো সদস্যের আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন’। কোনোভাবেই গণভোটকে নির্বাচনের সমার্থক বিবেচনার সুযোগ নেই, গণভোটে ভোটার কোনো আসনে বা কোনো সদস্যের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন না।

৬. প্রজ্ঞাপন জারির আগে গণভোট অধ্যাদেশ–প্রণেতা হিসেবে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আলোচনার সুযোগ নিলে তার স্বাধীন ভূমিকার চর্চা প্রশ্নবিদ্ধ হতো না, বরং অযাচিত বিভ্রান্তি পরিহার করা সম্ভব হতো।

৭. সর্বোপরি সরকার ও নির্বাচন কমিশন—উভয়েরই অপরিণামদর্শী পদক্ষেপের ফলে গণভোটে সরকারের সরাসরি ভূমিকাকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

৮. জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপ্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল অনুঘটক জুলাই সনদের ওপর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন সরকারের দায়িত্ব। এ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশন একমত না হওয়ার কোনো আইনগত বা যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না।

৯. তবে এ দায়িত্ব পালনে শুরু থেকেই সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি এনজিও, ব্যাংকসহ বিভিন্ন অংশীজনের ওপর অযাচিতভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সরকার নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোট পরিচালনার অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন।

১০. বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেহেতু সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বাধীন, সরকার তার কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও নির্দেশনা দেওয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি না নিয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে অহেতুক হস্তক্ষেপ করেছে।

১১. এই হস্তক্ষেপের কারণে বা অন্য যে বিবেচনায় হোক, নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নিষ্প্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন গণভোটকে বিতর্কিত করে ঐতিহাসিক গণভোট আয়োজনে নিজেদের প্রত্যাশিত ভূমিকা সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। সংস্থার উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এ সময় উপস্থিত ছিলেন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন