বন্ধ হয়ে গেল প্রধান উপদেষ্টার ওয়েবসাইট, পাওয়া যাচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নথি
![]() |
| প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট, এই ঠিকানায় আগে ছিল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট |
১৭ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। বর্তমানে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সব অনলাইন কার্যক্রম pmo.gov.bd ওয়েবসাইট থেকে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের জন্য আলাদা একটি ওয়েবসাইট cao.gov.bd ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে সেই ঠিকানায় প্রবেশ করতে গেলে তা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে নিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, প্রধান উপদেষ্টার সেই ওয়েবসাইটটি এখন আর আলাদাভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে এই ঠিকানা পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে প্রকাশিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও তথ্যও ওয়েবসাইট থেকে উধাও হয়ে গেছে। এর ফলে ওই সময়ের সিদ্ধান্তের রেকর্ড বা নথিপত্র খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট। তবে এই ঠিকানা বদলের সঙ্গে হারিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন নথি।
সরকার পরিবর্তনের পর সরকারপ্রধানের কার্যালয়ের ওয়েবসাইট বদলে যাওয়াকে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের ওয়েবসাইট সরিয়ে নেওয়া একটি সাধারণ নিয়ম। অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের আগের সরকারপ্রধানের ওয়েবসাইটটি সরিয়ে দিয়েছিল, এবারও ঠিক সেটিই করা হয়েছে।
তবে ওয়েবসাইট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে ফেলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাংবাদিক ও কলামিস্ট ডেভিড বার্গম্যান। তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিলগুলো সংরক্ষিত রাখা প্রয়োজন যাতে সাধারণ মানুষ সেগুলো সহজে খুঁজে পায়।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান আরও জানান, ওয়েবসাইটে থাকা নথিপত্র, ভাষণ ও অন্যান্য সরকারি দলিলগুলো সরকারি আর্কাইভে (নথিপত্র সংরক্ষণাগার) জমা থাকে। কেউ যদি সেগুলো দেখতে চান, তবে সঠিক নিয়ম মেনে আবেদন করলে তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
![]() |
| অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টার এই ফেসবুক পেজটি পরিচালিত হতো |
পরবর্তীতে গত বছরের এপ্রিল মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে ন্যাশনাল পোর্টালের অধীনে থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ওয়েবসাইট থেকে আগের সরকারের অপ্রয়োজনীয় ও প্রশংসামূলক তথ্য, ছবি ও ভিডিও সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এই নির্দেশনা পালনের সময় বেশ কিছু মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েবসাইট থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোও সরিয়ে ফেলেছে। এই প্রতিবেদনগুলো পরে আর ওয়েবসাইটে ফিরিয়ে আনা হয়নি। গত মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ওয়েবসাইট ঘুরে আগের সময়ের কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বাণিজ্য, ভূমি, কৃষি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এখনো আগের সরকারের সময়ের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো সংরক্ষিত রয়েছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মন্ত্রণালয়ের সিস্টেম অ্যানালিস্ট (পদ্ধতি বিশ্লেষক) জানান, যে প্রতিবেদনগুলো একবার সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সেগুলো আর পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ সেগুলো যথাযথভাবে আর্কাইভে বা নথিপত্র সংরক্ষণাগারে রাখা হয়নি।
ডেভিড বার্গম্যান জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ওয়েবসাইটটি ছিল সরকারি তথ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার। সেখানে অধ্যাপক ইউনূসের ভাষণ, নীতিগত বিভিন্ন ঘোষণা এবং সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসহ অনেক জরুরি দলিল জমা ছিল। ইন্টারনেটে মাত্র কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমেই আগে এই তথ্যগুলো সহজে পাওয়া যেত, যা এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিল সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য রাখার বিষয়টি নতুন সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। বার্গম্যান বলেন, এসব নথি শুধু জনগণের জন্যই নয়, সরকারের নিজের প্রয়োজনেও সচল থাকা জরুরি। নতুন সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট এবং সেখানে থাকা সব তথ্য ও নথিপত্র পুনরায় চালু করা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় 'চিফ অ্যাডভাইজার জিওবি' নামে একটি দাপ্তরিক ফেসবুক পাতা (পেজ) চালু ছিল। সেখানে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ও তথ্য প্রচার করা হতো। মূলত প্রধান উপদেষ্টার সংবাদ বিভাগ (প্রেস উইং) এই ফেসবুক পাতাটি পরিচালনা করত।
![]() |
| প্রথমে বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে জানানো হয়, প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজটি দলিল হিসেবে রেখে দেওয়া হবে |
অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর গত সপ্তাহে ওই ফেসবুক পাতাটিতে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, এটি আর সচল রাখা হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে আরেকটি বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়, কার্যক্রম বন্ধ হলেও একটি 'ঐতিহাসিক সময়ের দলিল' হিসেবে পাতাটি সবার দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।



Comments
Comments