[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

৫০ টাকার বিনিময়ে মিছিলে নারীরা, তবুও কমছে বরাদ্দ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
নির্বাচন এলেই মিছিলে যেতে ডাক পড়ে এই নারীদের। এবার তাঁরা মিছিলে যাচ্ছেন মাত্র ৫০ টাকার বিনিময়ে। শনিবার বিকেলে রাজশাহী নগরের রামচন্দ্রপুর এলাকায় পদ্মা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

শনিবার দুপুর। রাজশাহী শহরের রামচন্দ্রপুর নদীর ধারের বস্তির মাঠজুড়ে উড়ছে ভেজা কাপড়। বস্তিবাসীরা কাপড় ধুয়ে এই মাঠেই শুকাতে দেন। মাঠের এক কোণে মা ও মেয়ে রোদে বসে মাথায় চিরুনি করছেন। চিরুনি করতে করতে মেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘কাল মিছিলে গেলে, সেই টাকা কোথায়?’ মা উত্তর দিচ্ছেন, ‘আজ গেলে নাকি সব টাকা একসঙ্গে দেবে।’

নির্বাচনের সময় এই বস্তির বাসিন্দা নারীদের মিছিলে যাওয়ার ডাক পড়ে। মিছিলে গিয়ে তাঁরা পরিবারের জন্য কিছুটা বাড়তি আয়ের চেষ্টা করেন। এবার মিছিলের পারিশ্রমিক কমেছে, তবুও তাঁরা যাওয়া বন্ধ করেননি। এক দিন মিছিলে গেলে ৫০ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও লোক বেশি হয়ে গেলে তা কমিয়ে ৪০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। গত সাত দিন ধরে তাঁরা নিয়মিত মিছিলে যাচ্ছেন। বস্তির নারীদের সঙ্গে কথা বলে এই খবর জানা গেছে। ওই এলাকায় এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়, এ নিয়ে কারও মধ্যে কোনো লুকোছাপাও নেই। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা যেকোনো দল টাকা দিলেই মিছিলে যান। এবার বিএনপির মিছিলে যাওয়ার জন্য বস্তির নারীদের বেশি ডাকা হচ্ছে, তবে বরাদ্দের পরিমাণ কম।

বস্তির এই মাঠে বসে কথা হলো প্রায় ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁর জন্ম হয়েছিল রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায়। ছোটবেলাতেই মা মারা যান। শহরের এক ব্যক্তি তাঁকে বড় করে এই বস্তিতেই বিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী রিকশা চালাতেন, তিন বছর আগে তিনি মারা গেছেন। এই বৃদ্ধার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হলেও স্বামী নেশা করায় তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। দুই সন্তানকে নিয়ে মেয়ে এখন একটি ওষুধ কারখানায় কাজ করেন। বৃদ্ধা তাঁর সঙ্গেই থাকেন। অন্যদিকে, বৃদ্ধার ছেলে রিকশা চালান। তাঁর নিজেরই চারটি সন্তান, সংসার চালাতে হিমশিম খান। তাই বাধ্য হয়ে মিছিলে যাওয়ার ডাক পেলেই ছুটে যান এই বৃদ্ধা।

ওই মাঠের ঘাসের ওপর বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন প্রায় ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। তাঁর একটি হাত অচল। যতক্ষণ বসে ছিলেন, বাঁ হাত দিয়ে অচল ডান হাতটি মালিশ (ম্যাসাজ) করছিলেন। তিনি জানালেন, তাঁর দুই ছেলে। একজন বাসের চালকের সহকারী আর অন্যজন রিকশা চালান। ছেলেদের প্রতিদিন কাজ জোটে না, তাই সংসার ঠিকমতো চলে না। তিনি নিজে দুই দিন মিছিলে গিয়েছেন। সবার পেছনে থাকলেও মিছিলে তিনি থাকেন। এবার মিছিলে গেলে ৫০ টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর স্ত্রীও সঙ্গে যান। দুজন গেলে ১০০ টাকা হয়। তবে এবার দিনের টাকা দিনেই দিচ্ছে না; সব সময় এক দিন হাতে রেখে টাকা দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় তাঁদের মিছিল থেকে বেশি আয় হয়, কারণ তখন কাউন্সিলরসহ প্রার্থীর সংখ্যা বেশি থাকে।

ভাড়ায় মিছিল করলেও ভোট দেবেন কোন প্রতীকে—এমন প্রশ্নে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি তো ধানের শীষেই দিতে চাই। কিন্তু কাল বিকেলে রেলগেটের দিকে গিয়ে শুনি সবাই শুধু পাল্লা পাল্লা বলছে। আমাকেও বলেছে পাল্লায় ভোট দিতে। কোনো জবাব দিইনি, শুধু শুনে এলাম।’

কথা শোনার জন্য পাশে এসে বসলেন প্রায় ৭০ বছর বয়সী আরেক নারী। ৪০ দিন আগে তাঁর স্বামী মারা গেছেন, তিনি রিকশা চালাতেন। এখন দুই ছেলের কাছে থাকেন। তিনি নিজেই জানালেন, তাঁর এক ছেলে ছোট মুদি দোকান চালায়, আর অন্যজন রং ও পালিশের (বার্নিশ) কাজ করে। সংসার ভালো চলে না। তিনি নিজে অসুস্থ, চলাফেরা করতে পারেন না। ওষুধের অনেক খরচ। তাই তাঁর দুই ছেলের বউ মিছিলে যায়।

আরেকজন কম বয়সী নারী জানান, তাঁর স্বামী রিকশা চালান। তিনি সাত দিন মিছিলে গেছেন। প্রতিদিন ৫০ টাকা হিসেবে তিন দিনের টাকা পেয়েছেন। এখনো সব টাকা হাতে আসেনি। এক দিন দিচ্ছে, তো আরেক দিন দিচ্ছে না। অন্য এক নারীর স্বামী মারা গেছেন অনেক দিন আগে। তাঁর ছেলে রিকশা চালায়। তিনিও সাত দিন মিছিলে গিয়ে ৫০ টাকা করে পেয়েছেন।

স্থানীয় বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের এক নেতা এই এলাকার লোকজনকে মিছিলে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি জানান, বিশেষ করে যাঁদের কাজ নেই এবং বাড়িতে বসে থাকেন, এমন নারী ও পুরুষরাই একবেলা করে মিছিলে যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতা বলেন, এবার মিছিলের জন্য বরাদ্দ কম, হাতে টাকাও কম। তাই দৈনিক ৫০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। তবে টাকা একসঙ্গে দেওয়া হয় না; এক দিন হাতে রেখে আগের দিনেরটা মেটানো হয়। গত নির্বাচনে মিছিলে গেলেই মানুষ ১০০ টাকা করে পেয়েছিল। তিনি আরও বলেন, মূলত পেটের দায়ে এই এলাকার মানুষ মিছিলে যায়, কিন্তু তাঁদের দিকে কেউ নজর রাখে না। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন