‘অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা’ স্বীকার করে সুযোগ চাইলেন নাহিদ ইসলাম
![]() |
| জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ঢাকা, ৮ ফেব্রুয়ারি | ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া |
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভের কথা তুলে ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আবারও সুযোগ চেয়েছেন। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছি। সবকিছু মেনে নিয়েই আমরা আপনাদের কাছে আরেকবার সুযোগ চাইছি। এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন করুন।’
আজ রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া নির্বাচনী ভাষণে এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে যুক্ত হয়ে নাহিদ ইসলামের দল এনসিপি ৩০টি আসনে নির্বাচন করছে।
ভাষণে এনসিপি ও ১১-দলীয় ঐক্যের ১৮টি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। পরে তিনি বলেন, ‘এতক্ষণ যা বললাম, তা আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন। আপনারা যদি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ দেন, আমরা তা বাস্তবায়নে সক্ষম হব, ইনশা আল্লাহ। গত দেড় বছরে আপনারা দেখেছেন, কারা সংস্কারের বিরোধিতা করেছে, কারা নতুন ব্যবস্থা গড়ার পথে বাধা দিয়েছে, আর কারা পুরোনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছে। আমরা পরিবর্তন ও সংস্কারের রাজনীতি চাই। বাংলাদেশকে দুর্নীতি, বৈষম্য ও আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করে ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যেই এবার ১১টি দল ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এনসিপির শাপলা কলি মার্কায় ৩০ জন প্রার্থী বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচন করছেন। আমার আহ্বান ও অনুরোধ, আপনারা তরুণ প্রজন্মকে সুযোগ দিন।’
পরিবর্তনের রাজনীতি নাকি পুরোনো রাজনীতি বেছে নেবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের সামনে এসেছে—এ কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন ও সংস্কার চান। গত দেড় বছরে আমরা অনেক কিছুই করতে পারিনি। সেই হতাশা ও ক্ষোভ আমাদের আছে। আমরা আমাদের অনভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করছি। সবকিছু মেনে নিয়েই আমরা আপনাদের কাছে আরেকবার সুযোগ চাইছি। এবারের নির্বাচনে আপনারা এনসিপি ও ১১-দলীয় জোটকে সমর্থন করুন।’ তিনি আরও বলেন, ‘১১-দলীয় জোট আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে আমরা পরিবর্তন ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। আমরা শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করব। জুলাইয়ের খুনিদের বিচারও নিশ্চিত করব। গণভোটে আপনারা অবশ্যই ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেবেন।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় এবারের নির্বাচন হচ্ছে—এ কথা যেন কেউ ভুলে না যান, সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের তরুণ সমাজকে আবারও দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, যদি ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যর্থ হয়, যদি সুষ্ঠু নির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ আগস্টের বিপ্লব ব্যর্থ হবে। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের অর্জন ও মানুষের প্রত্যাশা এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সবার প্রতি আমার আহ্বান, ১২ ফেব্রুয়ারি আপনারা সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে আসবেন। আপনাদের ভোটাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা ভোটকেন্দ্রে থাকব। আমরা কথা দিচ্ছি, আপনাদের ভোটাধিকার কেউই কেড়ে নিতে পারবে না।’
নাহিদ ইসলাম তাঁর ভাষণে যেসব প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে প্রথমটি হলো ফ্যাসিস্ট যুগে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও হামলার বিচার নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধার করে জড়িতদের বিচার করা হবে। পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায্যতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নতজানু কূটনীতি থেকে বেরিয়ে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। ১৮ বছর বয়সের বেশি সব তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু, পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও হাইটেক বাহিনীতে রূপান্তর এবং ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলে মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতিও দেন নাহিদ ইসলাম।
ভাষণে তিনি বলেন, ১১-দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় গেলে ফ্যাসিবাদের ১৫ বছরে হাজারো মানুষ হত্যা, নির্যাতন, গুম ও খুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ বা অন্য কোনো নাম রাখা হবে। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর বিদ্যমান কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে পুনর্গঠন করা হবে।
সংখ্যালঘু হলেও কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা সহিংসতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কখনোই আফগানিস্তান হবে না, এটা বাংলাদেশই থাকবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো ধর্মানুরাগী উদারনৈতিক সমাজের কথা তুলে ধরেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকতাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবার সহাবস্থান থাকে। তাঁর ভাষায়, ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চার জায়গায়, আর রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন, ন্যায়বিচার ও ইনসাফের ভিত্তিতে।
নারীর অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, অর্থাৎ শূন্য সহনশীলতা নীতির কথাও বলেন নাহিদ ইসলাম। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কর্মসংস্থান, ন্যায্য মজুরি, প্রবাসী শ্রমিকের স্বার্থ, যোগাযোগ ও গণপরিবহন খাতের উন্নয়ন নিয়েও নানা প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। নাহিদ বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা পরিবহনব্যবস্থা থাকবে না, সবাইকে সাধারণ গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। মন্ত্রীদের অন্তত সপ্তাহে এক দিন এবং সচিবদের অন্তত সপ্তাহে দুই দিন গণপরিবহনে চলাচল করতে হবে।’
বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে একটি সুনীল অর্থনীতি গড়ে তোলাসহ নানা পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। এ ছাড়া পরিবেশদূষণ কমাতে পরিবেশ কর চালুর কথাও জানান তিনি।

Comments
Comments