[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন ভারতে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
 শেখ হাসিনা | ফাইল ছবি 

বাংলাদেশে তাদের পরিচয়, তারা পলাতক অপরাধী। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ কিংবা অর্থ চুরির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কলকাতার ভিড়ে ঠাসা কেনাকাটার কেন্দ্রের খাবার দোকানে বসে কফি আর দ্রুত তৈরি খাবারের টেবিলে আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতারা ব্যস্ত তাদের রাজনীতিতে ফেরার পরিকল্পনায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ৯ দিন বাকি থাকতে এক প্রতিবেদনে এমন চিত্র তুলে ধরেছে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

প্রতিবেদনের মূল কথা হলো, কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের বিশ্বাস, শেখ হাসিনা এখনো ‘নায়ক’ বেশেই দেশে ফিরতে পারবেন।

১৬ মাস আগে এক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবনের দিকে এগিয়ে গেলে তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের শেষ সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সেই আন্দোলনে দমন-পীড়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

এরপর সহিংসতা এবং একের পর এক মামলার মুখে শেখ হাসিনার দলের হাজারো নেতা-কর্মী দেশ ছাড়েন। তাদের মধ্যে ৬শর বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী কলকাতায় আশ্রয় নেন এবং বাংলাদেশ সীমান্তের কাছের এই ভারতীয় শহরেই তারা এতদিন আত্মগোপনে রয়েছেন বলে তথ্য দিয়েছে গার্ডিয়ান।

সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, ভারত তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড ও সংগঠন টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। 
অভ্যুত্থানের পক্ষের কয়েকটি সংগঠনের চাপে গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও স্থগিত করা হয়। ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশ শাসন করা দলটি।

হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে বাংলাদেশের বিভিন্ন আদালতে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

তবে গার্ডিয়ান লিখেছে, রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে গেছে—এমন চিন্তা মাথায়ও আনছেন না শেখ হাসিনা। ওই রায়কে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে তিনি ভারতে বসেই ফেরার পরিকল্পনা করছেন। এর অংশ হিসেবে আসন্ন নির্বাচন পণ্ড করতে হাজার হাজার সমর্থককে ‘উসকানি’ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা এক গোপন আশ্রয়স্থল থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক ও বাংলাদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ফোনে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতায় থাকাকালে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারত সরকারের চোখের সামনেই তার এসব কর্মকাণ্ড চলছে। তাকে ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ এড়িয়ে যাচ্ছে ভারত।’ 
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে নেওয়া হয়েছে দলীয় কৌশল নিয়ে আলোচনা করার জন্য। ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও ছিলেন তাদের মধ্যে।

সাদ্দামকে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকা আমাদের নেতা-কর্মী, তৃণমূল নেতৃত্ব ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তিনি আসন্ন সংগ্রামের জন্য দলকে প্রস্তুত করছেন।’

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে ‘নিষিদ্ধ সংগঠন’ ঘোষণা করেছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, সেসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

গার্ডিয়ানকে সাদ্দাম বলেছেন, শেখ হাসিনা কখনো কখনো দিনে ১৫-১৬ ঘণ্টা ফোন কল আর বৈঠক করে কাটান।

‘আমাদের নেত্রী খুব আশাবাদী; তিনি বিশ্বাস করেন, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা মনে করি, শেখ হাসিনা একজন নায়ক হিসেবেই ফিরে যাবেন।’ 
শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত শেষ তিনটি নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। আর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচন।

কিন্তু আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের বাদ দিয়ে ভোট হলে সেই নির্বাচনের কোনো গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।

শেখ হাসিনার সরকারের সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানককে উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের বলছি নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে, সব ধরনের প্রচার ও ভোট বর্জন করতে। এই প্রহসনে কোনোভাবেই অংশ না নিতে বলেছি।’ 

বাংলাদেশে নানকের বিরুদ্ধেও হত্যার অভিযোগে মামলা রয়েছে, সেসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করছেন।

গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকে ‘স্বৈরতন্ত্র ও লুটপাটের শাসন’ বলেন, তারা দলটির গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছেন।

মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের নথিপত্র অনুযায়ী, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভিন্নমত দমন ছিল নিয়মিত ঘটনা। হাজারো মানুষ গুম, নির্যাতন ও গোপন কারাগারে নিহত হন, যাদের অনেকের ভাগ্য জানা গেছে কেবল শেখ হাসিনার পতনের পর। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বনির্ভরতা ভেঙে পড়েছিল, আর নির্বাচন পরিণত হয়েছিল প্রহসনে।’ 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে নতুন গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। শেখ হাসিনার বিচারও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড না মানার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের নামে দেশে জনরোষ আর সহিংসতার ঢেউ উঠেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের শত শত কর্মী হামলার শিকার হয়েছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছেন বা জামিন ছাড়াই কারাবন্দি রয়েছেন। অনেকেই এখনো আত্মগোপনে।’ 

ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘আমরা কারাগারের ভয়ে কলকাতায় নেই। আমরা এখানে, কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।’ 

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতকে ক্রমেই বিব্রতকর প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

‘ভারতের মাটিতে নিষিদ্ধ একটি দলের কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া এবং বাংলাদেশের শীর্ষ পলাতক রাজনীতিবিদদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, ভারত থেকে তাদের ফেরত পাঠানোর কোনো আশঙ্কা তারা করছেন না।’ 

এক সপ্তাহ আগে দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে অডিও বক্তব্য দিলে প্রতিবেশী দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। গোপন আশ্রয়স্থল থেকে ধারণ করা ওই অডিও বক্তব্যে তিনি ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘জোর করে ক্ষমতা দখল’ ও বাংলাদেশকে ‘রক্তাক্ত’ করার অভিযোগ তোলেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ভারতের রাজধানীতে ওই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া এবং গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ঘৃণা ছড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা।’ 

গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘কলকাতায় আরামদায়ক বাসভবনে থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তাদের শাসনামলে ঘটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে খুব একটা অনুশোচনা দেখা যায়নি। তাদের অধিকাংশই ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনাকে গণ-অভ্যুত্থান মানতে নারাজ; তাদের দাবি, এটি ছিল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

কলকাতার উপকণ্ঠে কঠোর নিরাপত্তায় ঘেরা এক বিলাসবহুল বাড়ি থেকে কথা বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ওটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না। আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সন্ত্রাসীরা ক্ষমতা দখল করেছে।’ 

হত্যা আর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে নাছিম হেসে বলেন, ‘ভুয়া, ভুয়া, ভুয়া।’ 

গার্ডিয়ান লিখেছে, নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতাদের ফেরার পরিকল্পনা নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের সাফল্য-ব্যর্থতার ওপর। তাদের দাবি, এ নির্বাচন দেশে স্থিতিশীলতা বা শান্তি আনবে না, আর শেষ পর্যন্ত মানুষ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরবে।

‘২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কলকাতায় থাকা সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় হাতে গোনা কয়েকজনের একজন, যিনি অতীতের ‘ভুল’ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মানি, আমরা সাধু ছিলাম না। আমরা কর্তৃত্ববাদী ছিলাম। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলাম না। ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু ছিল না—এটা আমি স্বীকার করি। আরও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল, হয়নি–সেটা দুর্ভাগ্যজনক।’ 

দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনিয়ম ছিল, অবশ্যই। এমন আর্থিক বিষয় ছিল যা হওয়া উচিত হয়নি, তার দায় আমাদের নিতে হবে।’ 

তবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কলকাতায় থাকা আরও অনেক আওয়ামী লীগ নেতার মতো জয়ও মনে করেন, তার নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যদিও দেশে ফিরলে কারাগারে যেতে হতে পারে, সেটা তিনি স্বীকার করেন। এখন আমাদের সময়টা খুব ভালো নয়। কিন্তু আমার মনে হয় না খুব বেশি দিন এরকম থাকবে।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন