চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
![]() |
| ২১শে ফেব্রুয়ারির ব্যানারে নেই ভাষা শহিদদের ছবি! চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের টাঙানো তোরণে ৫২-র শহিদদের বদলে জায়গা পেয়েছে জুলাই শহিদ আবু সাঈদের ছবি। শনিবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের একটি ব্যানারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের প্রবেশপথে টাঙানো ওই ব্যানারে ভাষা শহিদদের পরিবর্তে জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদ আবু সাঈদের ছবি ব্যবহার করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সচেতন নাগরিকেরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ চত্বরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হয়। জেলা প্রশাসক মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদ, পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা খাইরুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তবে কলেজের মূল ফটকে জেলা প্রশাসনের টাঙানো ব্যানারে ভাষা শহিদদের ছবির অনুপস্থিতি এবং জুলাই শহিদের ছবি প্রাধান্য পাওয়ায় মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
ব্যানারটি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় পক্ষের সমর্থকদেরই প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে। ক্ষুব্ধ নাগরিকেরা বলছেন, ১৯৫২ সালের ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের দিনে তাদের ছবি বাদ দিয়ে অন্য সময়ের শহিদের ছবি ব্যবহার করা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের প্রতি চরম অবজ্ঞা।
ভাষা সৈনিক পরিবারের সন্তান ফায়জার রহমান কনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, 'আমি একজন ভাষা সৈনিকের সন্তান হিসেবে এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ভাষার অর্জনের সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা চলে না। এটি আমাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শামিল।'
একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক ডা. আ. আ. ম. মেসবাহুল হকের ছেলে মেসবাহুল সাকের বিষয়টিকে 'ইতিহাস বিকৃতির ঘৃণ্য অপচেষ্টা' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এদিকে বুধবার সকালে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদ সভাপতিত্ব করলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভাষা শহিদদের স্মরণে কোনো কথা না বলেই তিনি অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যান, যা উপস্থিত সুধীমহলকে বিস্মিত করেছে।
এদিকে বর্তমান জেলা প্রশাসকের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জেলায় আগে থেকেই নানামুখী গুঞ্জন বিদ্যমান ছিল। গত ১৫ অক্টোবর সাবেক সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত মোহাম্মদ সোলায়মানকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী—এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয় জামায়াত-শিবির সমর্থকরা তার নিয়োগের তীব্র বিরোধিতা করেন। এই আপত্তির মুখে মাত্র ২৯ দিনের মাথায় তাকে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব শাব্বীর আহমদের (যিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সন্তান) প্রভাবে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের প্রেক্ষাপটে বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদকে এখানে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ ও সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া বিভিন্ন সময়ে বর্তমান জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছেন। সচেতন মহলের ধারণা, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থেকেই ইতিহাসের এই বিচ্যুতি ঘটছে।
সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদ দাবি করেন, '২১শে ফেব্রুয়ারির আয়োজনে '৩৬শে জুলাই' (জুলাই অভ্যুত্থান) ফুটিয়ে তোলার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ ও ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষের শক্তিগুলো এই ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করতে নারাজ।'

Comments
Comments