পাবনায় ৬০০ রোগীর মুখে সাহ্রির হাসি, পাশে দাঁড়িয়েছে স্কয়ার গ্রুপ
![]() |
| পাবনা জেনারেল হাসপাতালে রোগী, স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সাহরি বিতরণ করে স্কয়ার গ্রুপ। শুক্রবার প্রথম প্রহরে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
পাবনার চাটমোহরের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী সাহেলা বেগম। নাতনিকে নিয়ে দুদিন ধরে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে আছেন। পবিত্র রমজান মাসে সাহ্রি নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই হাতে সাহ্রির খাবার পৌঁছে যাওয়ায় তাঁর সেই চিন্তা দূর হয়েছে।
শুধু সাহেলা বেগম নন, পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সব রোগী, তাঁদের স্বজন এবং চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য সাহ্রির ব্যবস্থা করেছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্কয়ার গ্রুপ। প্রতি রাতে ৬০০ জন মানুষ এখান থেকে বিনামূল্যে সাহ্রি পাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর উদ্যোগে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্কয়ার টয়লেট্রিজ যৌথভাবে পুরো রমজান মাসজুড়ে এই কর্মসূচি পালন করছে।
পাশাপাশি জেলা শহরের ‘তহুরা-আজিজ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও ৩০০ থেকে ৩৫০ জনকে বিনামূল্যে সাহ্রি দিচ্ছে। তাদের এই খাবার পৌঁছে যাচ্ছে শহরের রাতজাগা শ্রমিক, রিকশাচালক, পাহারাদারসহ ভাসমান মানুষের হাতে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের প্রধান ফটকে গিয়ে দেখা যায়, খাবারের প্যাকেট ও পানির বোতল নিয়ে একটি ছোট ট্রাক এসে পৌঁছাল। আরেকটি গাড়িতে এলেন স্কয়ার গ্রুপের একদল কর্মী। তাঁরা ট্রাক থেকে খাবার নামিয়ে ট্রলিতে করে বিতরণ শুরু করেন। প্রতিটি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় সেই প্যাকেট। সাহ্রির ঠিক আগ মুহূর্তে খাবার হাতে পেয়ে হাসপাতালে থাকা মানুষের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখা যায়।
স্কয়ারের কর্মীরা জানান, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সাহ্রির প্যাকেটগুলো তৈরি করা হয় এবং তাঁরা নিজেরাই তা বিতরণ করেন। খাবারের তালিকায় দিনভেদে খাসির মাংস, মুরগির মাংস, মাছ, ডিম ও সবজি থাকে। সঙ্গে দেওয়া হয় এক বোতল খাবার পানি।
সাহ্রি পেয়ে নার্গিস আক্তার নামে এক নারী বলেন, ‘হাসপাতালে রোগী নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। এর মধ্যে রাতে সাহ্রি পাওয়া খুব কঠিন ছিল। স্কয়ারের সাহ্রি পেয়ে অনেক উপকার হলো। তারা যেন এভাবেই মানুষের সেবা করে যেতে পারে, সেটাই চাই।’
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক তানজিরুল ইসলাম বলেন, স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর উদ্যোগ ও অনুপ্রেরণায় তাঁরা দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পুরো রমজান মাসজুড়ে এই সাহ্রি বিতরণের কাজ করছেন। এতে রোগী, তাঁদের স্বজন এবং চিকিৎসক ও নার্স—সবাই উপকৃত হচ্ছেন। তাঁদের জন্য কিছু করতে পেরে স্কয়ার পরিবারও আনন্দিত।
স্কয়ার টয়লেট্রিজের পরিচালক আবদুল খালেক জানান, স্কয়ারের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারী পর্যন্ত সবাই এই সাহ্রি কর্মসূচির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবার কাছে সাহ্রি পৌঁছে দেওয়ার পরই তাঁরা নিজেরা সাহ্রি করেন। এই কাজ করতে পেরে তাঁদেরও ভালো লাগছে।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে রাত দুইটার দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়েও একই চিত্র চোখে পড়ে। সেখানে সাহ্রি বিতরণ করছিলেন তহুরা-আজিজ ফাউন্ডেশনের কর্মীরা। অটোরিকশায় সাহ্রি নিয়ে ঘুরছিলেন কয়েকজন যুবক। তাঁরা হেঁকে বলছিলেন, ‘সাহ্রি লাগবে, সাহ্রি’। তাঁদের ডাকে ছুটে আসছিলেন শ্রমিক, রিকশাচালকসহ ভাসমান মানুষেরা। সাহ্রি নিয়ে হাসিমুখে আবারও যাঁর যাঁর কাজে ফিরে যাচ্ছিলেন তাঁরা।
সাহ্রি পেয়ে রিকশাচালক হাতেম মন্ডল বলেন, ‘আমরা তো সারা রাত রিকশা চালাই, বাড়িতে যাওয়া হয় না। আগে কলা-বিস্কুট খেয়ে রোজা রাখতাম। এখন এই খাবার পেয়ে অনেক উপকার হচ্ছে।’
তহুরা-আজিজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক দেওয়ান মাহবুব জানান, তাঁরা ২০১৮ সাল থেকে ছিন্নমূল মানুষের জন্য সাহ্রির আয়োজন করে আসছেন। সবার সহযোগিতা নিয়েই এই কাজ চলে। ফাউন্ডেশনের কর্মীরা নিজেরাই বাজার করা, রান্না, প্যাকেটজাত করা ও সাহ্রি বিতরণের কাজগুলো করেন। শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তাঁরা এই খাবার পৌঁছে দেন।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান বলেন, বিনামূল্যে সাহ্রি বিতরণের এই উদ্যোগ অনন্য। তিনি নিজেও কয়েকবার এই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাহ্রি বিতরণে অংশ নিয়েছেন। মানুষের মধ্যে যে স্বস্তি তিনি দেখেছেন, তার জন্য এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান।

Comments
Comments